গ্যাসের তীব্র সংকটেও থামছে না চুরি, বছরে ক্ষতি ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি

দেশে দীর্ঘদিন ধরে চলমান গ্যাস সংকট নতুন করে আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। আবাসিক গ্রাহকদের চুলায় গ্যাস না থাকা, সিএনজি স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ যানজট, শিল্প উৎপাদনে বিঘ্ন এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে চাপের মধ্যেই সামনে এসেছে আরেক উদ্বেগজনক তথ্য। সংশ্লিষ্ট খাতের হিসাব অনুযায়ী, অনুমোদিত সীমার বাইরে প্রতিবছর প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার গ্যাস চুরি হচ্ছে, যা সংকটকে আরও গভীর করছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, একদিকে সরকার বিপুল ভর্তুকি দিয়ে বিদেশ থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করছে, অন্যদিকে অবৈধ সংযোগ ও গ্যাস চুরির কারণে রাষ্ট্রীয় সম্পদের বড় অংশ অপচয় হচ্ছে। ফলে চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান কমানোর প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

সম্প্রতি কক্সবাজারের মহেশখালীতে একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার পর সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় আবাসিক গ্রাহকরা নিয়মিত গ্যাস পাচ্ছেন না। সিএনজি স্টেশনগুলোতে দেখা দিয়েছে দীর্ঘ লাইন, আর গ্যাসের অভাবে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমাতে বাধ্য হচ্ছে।

অবৈধ সংযোগের বিস্তার

গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলোর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, সাভার, মুন্সীগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ গ্যাস সংযোগ দীর্ঘদিন ধরে চালু রয়েছে। কোথাও কোথাও সরকারি নকশার বাইরে কিলোমিটারের পর কিলোমিটার পাইপলাইন স্থাপন করে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে।

অভিযান চালিয়ে নিয়মিত অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে কিছুদিন পর আবার তা পুনঃস্থাপন করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, স্থানীয় প্রভাবশালী মহল এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে অবৈধ সংযোগ উচ্ছেদ কার্যক্রম অনেক সময় বাধাগ্রস্ত হয়।

গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলোর কর্মকর্তারা মনে করেন, সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে কঠোর নির্দেশনা এবং সমন্বিত অভিযান ছাড়া অবৈধ সংযোগ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।

সিস্টেম লসের আড়ালে বিপুল ক্ষতি

বর্তমানে দেশে দৈনিক গড়ে প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গ্যাস খাতে মোট সিস্টেম লস প্রায় ৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ।

গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় ‘সিস্টেম লস’ বলতে পাইপলাইনে লিকেজ, রক্ষণাবেক্ষণজনিত ক্ষতি, মিটারিং ত্রুটি এবং অবৈধ ব্যবহারসহ বিভিন্ন কারণে হিসাবের বাইরে চলে যাওয়া গ্যাসকে বোঝানো হয়। তবে খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান সিস্টেম লসের বড় অংশই অবৈধ সংযোগ ও গ্যাস চুরির ফল।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) সর্বোচ্চ ২ শতাংশ সিস্টেম লস অনুমোদন করে। সেই হিসাবে বর্তমান ৯ দশমিক ৩৮ শতাংশের মধ্যে ৭ দশমিক ৩৮ শতাংশই অস্বাভাবিক ক্ষতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এ হিসাব অনুযায়ী প্রতিদিন প্রায় ২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস চুরি হচ্ছে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ১৪ কোটি টাকা। বছরে এ ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৫ হাজার ১১০ কোটি টাকা।

তিতাসে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি

রাষ্ট্রায়ত্ত ছয়টি গ্যাস বিতরণ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সিস্টেম লস হচ্ছে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিতে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির সিস্টেম লস দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

তিতাসের আওতাভুক্ত এলাকায় গত অর্থবছরে প্রায় এক লাখ ১৬ হাজার অবৈধ গৃহস্থালি সংযোগ এবং ৫৭৬টি বাণিজ্যিক ও শিল্প সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, অভিযান অব্যাহত থাকলেও অবৈধ সংযোগ পুরোপুরি নির্মূল করা যাচ্ছে না।

এলএনজি আমদানিতে বাড়ছে ভর্তুকি

দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে উৎপাদন কমে যাওয়ায় সরকারকে ক্রমবর্ধমান হারে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। বিদেশ থেকে আমদানি করা এলএনজি মহেশখালীর টার্মিনালে পুনরায় গ্যাসে রূপান্তর করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এলএনজি আমদানিতে ভর্তুকির পরিমাণ বেড়ে প্রায় ৮ হাজার ৯০০ কোটি টাকায় পৌঁছায়। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে চলতি অর্থবছরে এই ভর্তুকি প্রায় ১৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্যাস চুরি ও অবৈধ ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা গেলে আমদানি ব্যয় কমানোর পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থায়ও উল্লেখযোগ্য উন্নতি আনা সম্ভব।

টার্মিনাল দুর্ঘটনায় বেড়েছে সংকট

মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। বর্তমানে দেশের দুটি এলএনজি টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন ৯০ থেকে ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। এর একটি সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরবরাহ কমেছে প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট।

এর ফলে দৈনিক মোট গ্যাস সরবরাহ নেমে এসেছে প্রায় ২২০ কোটি ঘনফুটে। অথচ দেশে দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। ফলে গ্যাস ঘাটতি এখন চাহিদার প্রায় ৪২ শতাংশে পৌঁছেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনাল পুরোপুরি সচল হতে আরও এক থেকে দুই সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। ফলে আবাসিক, শিল্প, সিএনজি এবং বিদ্যুৎ খাতে চলমান ভোগান্তি অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, গ্যাস সংকট মোকাবিলায় শুধু আমদানি বাড়ানো নয়, অবৈধ সংযোগ ও চুরি বন্ধে কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াও জরুরি। অন্যথায় বিপুল ভর্তুকি দিয়েও কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন হবে।