তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে আলোচনা, সময় নির্ধারণে পারস্পরিক সমঝোতার কথা

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের সিদ্ধান্ত তাঁর নিজের এবং দুই দেশের পারস্পরিক বোঝাপড়ার ওপর নির্ভর করছে বলে জানিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ককে জনগণকেন্দ্রিক ভিত্তিতে আরও এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

বুধবার জাতীয় সংসদ ভবনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ও ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।

দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একজন অভিজ্ঞ ও জনবান্ধব নেতা। তাঁর ভারত সফরের বিষয়ে সিদ্ধান্ত তাঁর ওপরই ছেড়ে দেওয়া উচিত। দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে উভয় পক্ষের উদ্দেশ্য যদি জনগণের কল্যাণকে কেন্দ্র করে থাকে, তাহলে সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলোও এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।

তিনি আরও বলেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আলোচনা কখনো শেষ হয় না। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা অব্যাহত থাকবে এবং জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগ আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠনের পরপরই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ জানায় ভারত। পাশাপাশি সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনেও বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

তবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে বক্তব্য দেওয়ার পর বাংলাদেশ এ বিষয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানায়। এরপর তারেক রহমানের ভারত সফরের অনুকূল পরিবেশ তৈরির পাশাপাশি শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা এবং ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির হত্যা মামলার আসামিদের বাংলাদেশে হস্তান্তরের বিষয়টিও সামনে আসে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পর তাকে ফেরত পাঠানোর জন্য নয়াদিল্লির কাছে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানিয়েছে ঢাকা। ভারত জানিয়েছে, বিষয়টি তারা যথাযথ আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় পর্যালোচনা করছে।

সংসদীয় যোগাযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ

জাতীয় সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের সঙ্গে বৈঠকে দুই দেশের সংসদীয় সম্পর্ক জোরদারের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। দীনেশ ত্রিবেদী জানান, বাংলাদেশ ও ভারতের সংসদ সদস্যদের নিয়ে একটি ‘ফ্রেন্ডশিপ গ্রুপ’ গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

তার মতে, দলীয় রাজনীতির বাইরে দুই দেশের সংসদ সদস্যরা এ ধরনের প্ল্যাটফর্মে একসঙ্গে কাজ করতে পারেন। জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় সংসদীয় সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার পক্ষ থেকে বাংলাদেশের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে ভারত সফরের আমন্ত্রণও জানান তিনি। দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, বুধবার সকালে ওম বিড়লার সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে এবং বাংলাদেশের স্পিকারকে শুভেচ্ছা জানাতে বলেছেন তিনি।

বৈঠকে সংসদের কার্যক্রম ডিজিটাল করার বিষয়েও আলোচনা হয়। ভারতের সংসদে পুরোনো নথি, লাইব্রেরির বিভিন্ন তথ্য এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রীদের বক্তব্য ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষণের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের সঙ্গে ভাগাভাগির বিষয়টি উঠে আসে।

এ ছাড়া দুই দেশের সংসদীয় প্রতিনিধিদলের সফর বিনিময়, রোহিঙ্গা সংকট ও পুনর্বাসন, ক্রীড়া এবং সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান নিয়েও আলোচনা হয়েছে।

জনগণকেন্দ্রিক সম্পর্কের ওপর জোর

স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সঙ্গে সাক্ষাতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নানা দিক নিয়ে আলোচনা হয়। স্পিকার বলেন, ঐতিহাসিকভাবে দুই দেশের সম্পর্ক বিভিন্ন সময়ের রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক বাস্তবতায় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে।

তিনি বলেন, ভবিষ্যতে দুই দেশের সম্পর্ক শুধু সরকারকেন্দ্রিক না হয়ে জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগ ও স্বার্থের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা উচিত। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যাশাও জানান তিনি।

জবাবে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার বিষয়ে ভারত আগ্রহী। দুই দেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষা পূরণে এ ধরনের যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ।

বৈঠকে স্পিকারকে একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ হিসেবে উল্লেখ করার পাশাপাশি তাঁর ক্রীড়া-সংশ্লিষ্টতারও প্রশংসা করেন ভারতীয় হাইকমিশনার।

সময় নির্ধারণে পারস্পরিক সুবিধার কথা বাংলাদেশের

প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের বিষয়ে চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম মনি বলেন, প্রতিবেশী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ ভারতকে উপেক্ষা করবে না এবং ভারতও বাংলাদেশকে উপেক্ষা করে না। দুই দেশের সরকার ও প্রধানমন্ত্রীর সময়সূচি বিবেচনা করে পারস্পরিক সুবিধাজনক সময়ে সফরটি হতে পারে।

তিনি বলেন, ভারত সফরে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কোনো আপত্তি নেই। তবে সফরের নির্দিষ্ট সময় বা তারিখ একতরফাভাবে নির্ধারণ করার সুযোগ নেই। একটি স্বাধীন দেশের প্রধানমন্ত্রী নিজের সময় ও দেশের স্বার্থ বিবেচনা করেই সফরের সিদ্ধান্ত নেবেন।

ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতির কথা তুলে ধরে চিফ হুইপ বলেন, জাতীয় স্বার্থ, মর্যাদা, সম্মান ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে চায় সরকার।

তিনি আরও বলেন, কোনো দেশের ভূখণ্ড যেন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ব্যবহার না হয়, একইভাবে বাংলাদেশের ভূখণ্ডও যেন কোনো প্রতিবেশী দেশের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত না হয়, সেটিই সরকারের অবস্থান।

পানি ও সীমান্ত ইস্যুতে বাংলাদেশের উদ্বেগ

ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে পানিবণ্টনকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অমীমাংসিত বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেন নূরুল ইসলাম মনি। তাঁর মতে, বাংলাদেশ ভাটির দেশ হওয়ায় উজান থেকে পানির প্রবাহ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা সমস্যা রয়েছে। এ কারণে পানি সংরক্ষণে বাংলাদেশকে বড় ধরনের প্রকল্প গ্রহণ করতে হচ্ছে।

সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া এবং বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি নিহত হওয়ার ঘটনাও তিনি তুলে ধরেন। এসব বিষয় মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলে দুই দেশের সম্পর্কের অনেক জটিলতা কমানো সম্ভব বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এ ছাড়া ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নিপীড়ন, গুম, খুন ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের কেউ কেউ ভারতে অবস্থান করছেন বলে অভিযোগ করেন চিফ হুইপ। মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের কোনো ধরনের আশ্রয় বা প্রশ্রয় না দেওয়ার জন্য ভারতের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

গত ১৭ বছরে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পরিস্থিতি নিয়ে ভারতের ভূমিকারও সমালোচনা করেন নূরুল ইসলাম। তাঁর ভাষায়, দুই দেশের সম্পর্ক আরও গভীর করতে হলে বাংলাদেশের জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও সার্বভৌম মর্যাদার প্রতি সম্মান প্রদর্শন জরুরি।

সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের সম্ভাবনা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত থাকলেও সফরের নির্দিষ্ট সময় এখনো চূড়ান্ত হয়নি। দুই পক্ষই পারস্পরিক স্বার্থ ও জনগণের কল্যাণকে গুরুত্ব দিয়ে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার কথা বলছে।