তরুণদের ব্যবসায় যুক্ত করতে ১ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রস্তাবিত এ তহবিল থেকে সহজ শর্তে কম সুদে ঋণ দেওয়ার পাশাপাশি ব্যবসায় ভালো ফল ও ঋণ পরিশোধের সক্ষমতার ভিত্তিতে অনুদান দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রাথমিকভাবে তহবিলের ৫০০ কোটি টাকা ঋণ এবং বাকি ৫০০ কোটি টাকা অনুদানের জন্য বরাদ্দ রাখার কথা ভাবা হচ্ছে। এর মাধ্যমে অন্তত ৫ হাজার নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
নতুন এই কর্মসূচির বাস্তবায়ন নিয়ে মঙ্গলবার বিকেলে ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। বৈঠকে তহবিলের কাঠামো, ঋণ বিতরণ, উদ্যোক্তা নির্বাচন ও অনুদান দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠক শেষে এবিবির চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন সাংবাদিকদের বলেন, তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন ও অনুদান প্যাকেজ তৈরির কাজ চলছে। যেসব তরুণ ব্যবসা শুরু করতে আগ্রহী হলেও মূলধনের অভাবে উদ্যোগ নিতে পারছেন না, তাদের এই কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা ঋণ
মাসরুর আরেফিন জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন ব্যবস্থার আওতায় একজন উদ্যোক্তা সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ পেতে পারেন। এ ঋণের সুদহার ৪ থেকে ৬ শতাংশের মধ্যে রাখার প্রস্তাব রয়েছে।
বর্তমানে প্রচলিত ব্যাংকঋণের সুদহার প্রায় ১১ থেকে ১৫ শতাংশ এবং এনজিও ঋণের তুলনায় এ ব্যবস্থায় উদ্যোক্তাদের অর্থ সংগ্রহের খরচ তুলনামূলকভাবে কম হবে বলে জানান তিনি।
এই ঋণের জন্য কোনো জামানত নেওয়া হবে না বলেও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। ফলে জমি বা অন্য কোনো সম্পদ বন্ধক দেওয়ার সক্ষমতা না থাকলেও যোগ্য তরুণরা ব্যবসা শুরু করার সুযোগ পাবেন।
ঋণের পাশাপাশি মিলতে পারে অনুদান
উদ্যোক্তাদের ব্যবসা টেকসই করার জন্য ঋণের পাশাপাশি অনুদানের ব্যবস্থাও রাখা হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, উদ্যোক্তা নিয়মিত ঋণের কিস্তি পরিশোধ করলে এবং ব্যবসার কার্যক্রম সন্তোষজনক হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) তহবিল থেকে অনুদান দেওয়া হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে ঋণের পরিমাণের সমপরিমাণ অর্থ পর্যন্ত অনুদান পাওয়ার সুযোগ তৈরির বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। অর্থাৎ, কোনো উদ্যোক্তা ১০ লাখ টাকা ঋণ পেলে নির্ধারিত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে পরবর্তী সময়ে সর্বোচ্চ আরও ১০ লাখ টাকা অনুদান পাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন।
উপজেলা পর্যায়ে উদ্যোক্তা বাছাই
তহবিলের অর্থ যেন প্রকৃত উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছায়, সে জন্য উপজেলা পর্যায়ে বাছাই প্রক্রিয়াকে গুরুত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় ব্যাংক শাখার ব্যবস্থাপক অথবা নির্ধারিত কমিটির মাধ্যমে সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা চিহ্নিত করা হবে। এতে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাব খাটিয়ে অযোগ্য ব্যক্তির ঋণ পাওয়ার সুযোগ কমানোর চেষ্টা থাকবে।
এবিবির চেয়ারম্যান জানান, দেশের ৫০০টির বেশি উপজেলায় ব্যাংকগুলো নিজেদের মধ্যে দায়িত্ব ভাগ করে সম্ভাব্য উদ্যোক্তাদের খুঁজে বের ও যাচাই করবে। ব্যবসার সম্ভাবনা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দক্ষতা এবং উদ্যোগ বাস্তবায়নের সক্ষমতাকে নির্বাচনের ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
যেসব খাত পেতে পারে অগ্রাধিকার
প্রস্তাবিত তহবিলের অর্থ ব্যবহারে নির্দিষ্ট কোনো একটি খাতকে সীমাবদ্ধ রাখার পরিকল্পনা নেই। উৎপাদন ও বাণিজ্য উভয় ধরনের উদ্যোগই এর আওতায় আসতে পারে।
সম্ভাব্য খাতগুলোর মধ্যে মৎস্য চাষ, প্রাণিসম্পদ, খাদ্য উৎপাদন, হস্তশিল্প, শতরঞ্জি তৈরি এবং অন্যান্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার কথা বিবেচনা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও ব্যাংকারদের সংগঠনের আলোচনায় উদ্যোক্তাদের শুধু অর্থায়ন নয়, ব্যবসা টিকিয়ে রাখার সক্ষমতা তৈরির বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে তরুণদের কর্মসংস্থানপ্রত্যাশী থেকে উদ্যোক্তায় পরিণত করার পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ বাড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
