ক্যামেরুনের প্রেসিডেন্ট পল বিয়ার দীর্ঘদিন দেশের বাইরে অবস্থান করা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। ৯৩ বছর বয়সী এই প্রেসিডেন্ট গত ৭ জুন ইউরোপে যাওয়ার পর এখনো দেশে ফেরেননি। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তিনি সুস্থ আছেন এবং শিগগিরই দেশে ফিরবেন। তবে তার দীর্ঘ অনুপস্থিতি ঘিরে স্বাস্থ্য ও রাষ্ট্র পরিচালনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধীরা।
১৯৮২ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আহমাদু আহিদজো পদত্যাগ করার পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে থাকা পল বিয়া রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব নেন। ১৯৮৪ সালে একদলীয় নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর পরবর্তী সময়ে বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা চালু হলেও একের পর এক নির্বাচনে জয় পেয়ে ক্ষমতায় থেকে যান তিনি। এভাবে প্রায় ৪২ বছর ধরে ক্যামেরুন শাসন করছেন বিয়া।
১৯৮৪ সালে বিয়া যখন প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হন, তখন দেশটির এক তরুণ শিক্ষার্থী নফোরমি বিমের বয়স ছিল ২৩ বছর। বর্তমানে বিমের বয়স ৬৫ বছর এবং তিনি শিক্ষকতা থেকে অবসর নিয়েছেন। তার পুরো কর্মজীবনজুড়েই দেশের প্রেসিডেন্ট ছিলেন বিয়া।
গত বছর অনুষ্ঠিত বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অষ্টম মেয়াদে জয় পান বিয়া। নির্বাচনের আগে তিনি বলেছিলেন, তার ‘সেরা সময় এখনও আসা বাকি’। তবে বিরোধীরা নির্বাচনকে কারচুপিতে ভরা বলে অভিযোগ করেন। নির্বাচন ঘিরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের প্রাণঘাতী সংঘর্ষও হয়।
প্রেসিডেন্টের দপ্তর জানিয়েছে, গত ৭ জুন তিনি ‘স্বল্প সময়ের ব্যক্তিগত সফরে’ ইউরোপে যান। কয়েক বছরের মধ্যে এবারই নিজের দেশে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় অনুপস্থিত রয়েছেন তিনি।
সরকারের মুখপাত্র রেনে এমানুয়েল সাদি ফরাসি গত সপ্তাহে রেডিও আরএফআইকে জানান, বিয়া সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় রয়েছেন এবং কোনো হাসপাতালে ভর্তি নন। তবে প্রেসিডেন্টের শারীরিক অবস্থা বা তার সুনির্দিষ্ট অবস্থান সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি।
দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে থাকার কারণে প্রেসিডেন্টের স্বাস্থ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে তার অনুপস্থিতিতে কার্যত কে দেশ পরিচালনা করছেন, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। যদিও সরকারের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রশাসনের নিয়মিত কার্যক্রম চালু রয়েছে এবং প্রেসিডেন্ট দূর থেকেই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
দেশটির বেশিরভাগ নাগরিকের বয়স তুলনামূলকভাবে কম। তাদের বড় একটি অংশের কাছে পল বিয়া ছাড়া অন্য কোনো প্রেসিডেন্টের স্মৃতি নেই। বিদেশে অবস্থান করেও তিনি সশস্ত্র বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ে রদবদলের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন বলে জানা গেছে।
বিরোধীদলীয় তরুণ নেতা স্যামুয়েল হিরাম ইয়োদি প্রেসিডেন্টের দীর্ঘ অনুপস্থিতির বিষয়টি বিবেচনা করে সাংবিধানিক কাউন্সিলের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট পদ শূন্য ঘোষণার উদ্যোগ নিতে পার্লামেন্টের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তবে পার্লামেন্টে বিয়ার ক্ষমতাসীন দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় এমন উদ্যোগ বাস্তবায়নের সম্ভাবনা খুবই কম।
অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নফোরমি বিমে আশির দশকের শুরুর সময়ের কথা স্মরণ করে বলেন, বিয়া যখন ক্ষমতায় এসেছিলেন, তখন তরুণদের মধ্যে তাকে ঘিরে ব্যাপক আশাবাদ ছিল। তারা তাকে তরুণ, গতিশীল ও পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে দেখেছিলেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার পর সেই আশা হতাশায় পরিণত হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
জার্মানিতে বসবাসরত ক্যামেরুনীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক কলিন্স মোলুয়া ইকমের মতে, দীর্ঘ শাসনামলে দেশের অবকাঠামো ও নাগরিক সেবার মান উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়েছে। জরাজীর্ণ সড়ক, ঘনঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট, দুর্নীতি এবং তরুণদের বেকারত্ব এখন দেশটির বড় সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে।
ডচাং বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক আইনের অধ্যাপক উইলসন তামফু বলেন, প্রেসিডেন্ট দেশে না থাকলেও সরকারের দৈনন্দিন কার্যক্রম চালানোর মতো প্রশাসনিক কাঠামো রয়েছে। তবে বড় চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় রাজনৈতিক নেতৃত্বের সক্রিয় উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে।
বিশেষ করে ক্যামেরুনের ইংরেজিভাষী অঞ্চলগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে চলা বিচ্ছিন্নতাবাদী সংঘাত, উত্তরাঞ্চলে বোকো হারামের হামলা এবং তরুণদের অর্থনৈতিক হতাশা এখনো বড় সমস্যা হয়ে আছে। এসব সংকট সমাধানে কার্যকর উদ্যোগের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
ক্যামেরুনে মানুষের গড় আয়ু ৭০ বছরেরও কম। এর বিপরীতে ৯৩ বছর বয়সেও প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বিয়া। তার দীর্ঘ বিদেশ অবস্থান এবং বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার বিষয়টি নিয়েও দেশটিতে সমালোচনা রয়েছে।
এদিকে সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক বিমের ভাষায়, দেশের শাসকদের সামান্য অসুস্থতাতেও বিদেশে চিকিৎসার সুযোগ রয়েছে, অথচ সাধারণ মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা না পেয়ে মারা যায়।
চার দশকের বেশি সময় ধরে একই ব্যক্তির নেতৃত্বে থাকা ক্যামেরুনে এখন তাই শুধু প্রেসিডেন্টের দেশে ফেরার অপেক্ষাই নয়, তার পরবর্তী রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং দীর্ঘদিনের শাসনের অবসানের পর দেশ কোন পথে যাবে, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
