পরিবহন, শিল্প ও কৃষিতে বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর পরামর্শ আইইএর
- নিজস্ব প্রতিবেদক
পরিবহন, শিল্প ও কৃষিতে জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে পারলে জ্বালানি আমদানির ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা কমতে পারে। একই সঙ্গে কমতে পারে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ-সংকটের ঝুঁকি। তবে এ জন্য নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশের বিদ্যুৎ গ্রিড আধুনিক ও শক্তিশালী করার প্রয়োজন রয়েছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) নতুন এক বিশেষ প্রতিবেদনে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বিদ্যুতায়নের এমন সম্ভাবনার কথা তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশেষ করে যেসব দেশ জ্বালানি আমদানিনির্ভর, সেখানে পরিবহন, শিল্প ও কৃষিতে বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো হলে অর্থনৈতিক ও জ্বালানি নিরাপত্তা উভয় ক্ষেত্রেই সুবিধা পাওয়া যেতে পারে।
বাংলাদেশে এর সম্ভাবনা রয়েছে পরিবহন, তৈরি পোশাক ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প এবং কৃষিতে। তবে বিদ্যুৎ উৎপাদনে যদি আমদানি করা তেল, গ্যাস বা কয়লার ওপর নির্ভরতা থেকেই যায়, তাহলে শুধু জ্বালানির ধরন পরিবর্তন করে আমদানিনির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে না। তাই বিদ্যুতায়নের পাশাপাশি নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে আইইএ।
বছরে ১০ হাজার কোটি ডলারের বেশি সাশ্রয়ের সম্ভাবনা
বাংলাদেশের জন্য আলাদাভাবে কত অর্থ সাশ্রয় হতে পারে, প্রতিবেদনে তার হিসাব দেওয়া হয়নি। তবে আইইএর হিসাবে, দ্রুত বিদ্যুতায়ন করা গেলে চীন ছাড়া অন্যান্য উদীয়মান ও উন্নয়নশীল দেশ ২০৩৫ সালের মধ্যে সম্মিলিতভাবে বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি জ্বালানি আমদানি ব্যয় কমাতে পারে। এই পরিমাণ ২০২৫ সালে ওই দেশগুলোর মোট জ্বালানি আমদানি ব্যয়ের এক-চতুর্থাংশেরও বেশি।
বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পরিবহনসহ বিভিন্ন খাতে জ্বালানি তেল, এলএনজি ও কয়লার আমদানি রয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে গেলে কিংবা সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে দেশের অর্থনীতি ও জ্বালানি খাতেও এর প্রভাব পড়ে।
বৈদ্যুতিক দুই ও তিন চাকার যান
পরিবহন খাতে বিদ্যুতায়নের বড় সুযোগ দেখছে আইইএ। সংস্থাটির মতে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর শহরগুলো সাধারণত ঘনবসতিপূর্ণ এবং মানুষের দৈনিক যাতায়াতের দূরত্বও তুলনামূলক কম। এ কারণে বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেল ও তিন চাকার যান এসব দেশে কার্যকর বিকল্প হতে পারে।
বর্তমানে বাজারে থাকা জনপ্রিয় বৈদ্যুতিক দুই ও তিন চাকার যানগুলোর ব্যাটারি একবার চার্জে উন্নয়নশীল দেশের মানুষের গড় দৈনিক যাতায়াতের প্রায় ১০ গুণ দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে। পাশাপাশি তেলচালিত যানবাহনের তুলনায় পরিচালন ব্যয় কম হওয়ায় বৈদ্যুতিক যান কেনার অতিরিক্ত খরচ সাধারণত তিন থেকে ছয় বছরের মধ্যে উঠে আসতে পারে।
দক্ষিণ এশিয়ার জন্য এ সম্ভাবনা আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এ অঞ্চলের কয়েকটি দেশ পরিবহনে ব্যবহৃত জ্বালানির জন্য ব্যাপকভাবে আমদানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে বৈদ্যুতিক যান বাড়ানো গেলে তেল আমদানি ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
আইইএর হিসাবে, দ্রুত বিদ্যুতায়ন করা হলে ২০৩৫ সাল নাগাদ বিশ্বে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ ব্যারেল তেলের ব্যবহার এড়ানো সম্ভব হতে পারে। এর প্রায় ৮০ শতাংশই হবে জ্বালানি আমদানিনির্ভর অঞ্চলে।
পোশাক ও খাদ্যশিল্পে বিদ্যুতের ব্যবহার
বাংলাদেশের জন্য শিল্প খাতেও বিদ্যুতায়নের বড় সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, বস্ত্র, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, দুগ্ধ, ওষুধ ও পানীয় শিল্পে তুলনামূলক কম তাপমাত্রায় গরম পানি, বাষ্প ও শুকানোর মতো কাজে জ্বালানি ব্যবহার করা হয়।
এসব ক্ষেত্রে জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে বৈদ্যুতিক বয়লার ও শিল্প হিট পাম্প ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। ইস্পাত ও সিমেন্টের মতো ভারী শিল্পের তুলনায় এসব খাতে বিদ্যুতায়ন তুলনামূলক সহজ।
আইইএর হিসাবে, বিশ্বে শিল্প খাতে নিম্ন ও মাঝারি তাপমাত্রার কাজে ব্যবহৃত জ্বালানির প্রায় ৪০ শতাংশ বর্তমান প্রযুক্তি ব্যবহার করেই সাশ্রয়ীভাবে বিদ্যুৎ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাত রপ্তানি অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়ায় এর প্রভাব আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও পড়তে পারে। বৈশ্বিক ক্রেতা ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো সরবরাহব্যবস্থায় কার্বন নিঃসরণ কমানোর দিকে ক্রমেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে কম কার্বন নিঃসরণকারী বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে বাংলাদেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
কৃষিতে সৌরচালিত সেচের সম্ভাবনা
কৃষি খাতেও বিদ্যুতায়নকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে আইইএ। সংস্থাটির হিসাবে, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় জিডিপিতে কৃষির অবদান ১ থেকে ২ শতাংশ হলেও দক্ষিণ এশিয়া ও সাব-সাহারান আফ্রিকায় তা ১৭ থেকে ১৯ শতাংশ।
এ কারণে দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিতে কৃষির বিদ্যুতায়নের প্রভাব তুলনামূলক বেশি হতে পারে। বিশেষ করে সেচব্যবস্থায় সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।
যেসব এলাকায় গ্রিডের বিদ্যুৎ নেই অথবা সরবরাহ নির্ভরযোগ্য নয়, সেখানে ডিজেলচালিত সেচপাম্পের পরিবর্তে সৌরচালিত পাম্প ব্যবহার করা যেতে পারে। একই সঙ্গে কৃষিপণ্য সংরক্ষণে হিমাগার ও রেফ্রিজারেশন ব্যবস্থায় বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
বিদ্যুতায়নের বড় চ্যালেঞ্জ দুর্বল গ্রিড
তবে পরিবহন, শিল্প ও কৃষিতে বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়বে। তাই নিরবচ্ছিন্ন ও নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে বড় চ্যালেঞ্জ।
আইইএ বলছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর বিদ্যুতায়নের অন্যতম প্রধান বাধা হলো অনির্ভরযোগ্য ও ব্যয়বহুল গ্রিড বিদ্যুৎ। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না থাকলে বৈদ্যুতিক প্রযুক্তি বেশি দক্ষ হওয়া সত্ত্বেও শিল্পকারখানাগুলো ডিজেল বা গ্যাসচালিত যন্ত্রপাতির ওপর নির্ভর করতে পারে।
এ কারণে বিদ্যুতায়নের পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থায় বিনিয়োগ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি। পাশাপাশি ব্যাটারি ও অন্যান্য বিদ্যুৎ সংরক্ষণব্যবস্থা, আধুনিক গ্রিড এবং বিদ্যুতের চাহিদা ব্যবস্থাপনা জোরদার করার প্রয়োজন রয়েছে।
আইইএর হিসাবে, দ্রুত বিদ্যুতায়নের জন্য ২০৩৫ সাল পর্যন্ত বিশ্বে বিদ্যুৎ গ্রিড সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নের গতি গত এক দশকের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বাড়াতে হবে।
নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎই মূল বিষয়
বিদ্যুতায়নের মাধ্যমে জ্বালানি আমদানির চাপ কমাতে হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎসও গুরুত্বপূর্ণ। শুধু পরিবহন, শিল্প বা কৃষিতে তেল-গ্যাসের পরিবর্তে বিদ্যুৎ ব্যবহার করলেই আমদানিনির্ভরতা কমবে না।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আমদানি করা এলএনজি, তেল বা কয়লা দিয়ে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ব্যবহার করে সরাসরি জ্বালানি আমদানি কমানোর সুযোগ সীমিত। এতে আমদানিনির্ভরতা এক খাত থেকে অন্য খাতে স্থানান্তরিত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে।
আইইএর মতে, বিদ্যুতায়নের সবচেয়ে বড় সুফল পাওয়া যাবে যখন বাড়তি বিদ্যুৎ দেশীয় ও কম কার্বন নিঃসরণকারী উৎস থেকে উৎপাদিত হবে। বিশেষ করে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন, গ্রিড সম্প্রসারণ এবং বিদ্যুৎ সংরক্ষণব্যবস্থা একসঙ্গে বাড়ানো গেলে জ্বালানি নিরাপত্তার সুবিধা আরও বাড়বে।
বৈশ্বিকভাবে বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ছে
বিশ্বের মোট চূড়ান্ত জ্বালানি ব্যবহারে বর্তমানে বিদ্যুতের অংশ প্রায় ২৩ শতাংশ। আইইএ বলছে, বর্তমানে বিদ্যমান প্রযুক্তি সাশ্রয়ীভাবে ব্যবহার করেই এ হার প্রায় ৩৩ শতাংশে নেওয়া সম্ভব। ২০৩৫ সালের মধ্যে তা ৩৫ শতাংশে নেওয়ার একটি বৈশ্বিক লক্ষ্য নিয়েও আলোচনা চলছে।
তবে সব দেশের জন্য বিদ্যুতায়নের একই পথ কার্যকর হবে না বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। একটি দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো, জ্বালানির মূল্য, বিদ্যুৎ অবকাঠামো এবং অর্থায়নের সুযোগের ওপর নির্ভর করবে বিদ্যুতায়নের গতি ও সম্ভাব্য সুফল।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও তাই নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো, গ্রিড শক্তিশালী করা এবং পরিবহন, শিল্প ও কৃষিতে বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর সমন্বিত উদ্যোগই জ্বালানি আমদানির ঝুঁকি কমানোর অন্যতম পথ হতে পারে।
