চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) উপাচার্য পদে অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে শিক্ষার্থীদের ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি সপ্তম দিনেও অব্যাহত রয়েছে। একই দাবিতে দ্বিতীয় দিনের মতো সর্বাত্মক কর্মবিরতি ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সংহতি জানিয়েছেন।
শাটডাউন কর্মসূচির কারণে সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। সকাল ৮টা থেকে ক্যাম্পাসের মূল ফটক বন্ধ করে অবস্থান নেন শিক্ষার্থীরা। পরে সকাল ৯টা থেকে শুরু হয় গণস্বাক্ষর সংগ্রহ কর্মসূচি। দুপুরে শিক্ষার্থীরা ‘শ্বেত শাড়ির গণসাক্ষ্য’ কর্মসূচিও পালন করেন।
সাদা শাড়িতে রং-তুলি ও মার্কার দিয়ে অধ্যাপক সায়েমের প্রতিকৃতি এবং তাঁর ৫৬ দিনের দায়িত্বকালের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরেন শিক্ষার্থীরা। তাঁদের ভাষ্য, বিদায়ী উপাচার্যের সময়ে নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ ও উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলো স্মরণে রাখতেই এ কর্মসূচি।
আন্দোলনরত এক শিক্ষার্থী বলেন, “যতক্ষণ না আমাদের দাবি আদায় হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা ফিরে যাব না। আমরা ক্যাম্পাস ত্যাগ করব না। আমরা চুয়েটের সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিশ্বাস করি, দেশনেতা তারেক রহমান আমাদের বিষয়টি বিবেচনা করবেন এবং একটি সুষ্ঠু সমাধানের মাধ্যমে অতিসত্ত্বর আমাদের ক্লাসে ফেরার ব্যবস্থা করবেন।”
আরেক শিক্ষার্থী বলেন, “অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে উপাচার্য পদে পুনর্বহালের দাবিতে কমপ্লিট শাটডাউনের আজ সপ্তম দিন। বিক্ষোভ ও গণঅবস্থান কর্মসূচি আমরা চালিয়ে যাচ্ছি। আমরা চাই সরকার দ্রুত বিষয়টি নিষ্পত্তি করুক।”
আন্দোলনরত এক ছাত্রী বলেন, “এক সপ্তাহ পেরিয়ে যাচ্ছে, এখন পর্যন্ত আমাদের দাবিগুলো মেনে নেওয়া হয়নি। আমরা একাডেমিক কার্যক্রম থেকে পিছিয়ে যাচ্ছি। দ্রুত একাডেমিক কাজে ফিরতে চাই। তাই সায়েম স্যারকে উপাচার্য পদে পুনর্বহাল করা হোক।”
শিক্ষার্থীরা জানান, সোমবার বিকেলেও ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করার কর্মসূচি রয়েছে। সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে বাংলা চলচ্চিত্র ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ প্রদর্শনেরও পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
শিক্ষক-কর্মকর্তাদের অবস্থান
এদিকে অধ্যাপক সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে চুয়েট শিক্ষক সমিতি। বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত উপাচার্য ভবনের সামনে অবস্থান করেন শিক্ষকরা। এর আগে সকাল থেকেই প্রশাসনিক ভবনের সামনেও তাঁদের অবস্থান করতে দেখা যায়।
চুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সৈয়দ মাসরুর আহম্মদ বলেন, “আমাদের দাবি একটাই, সরকার যে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে, সেই প্রজ্ঞাপন আমরা প্রত্যাহার চাইছি। এর উদ্দেশ্য হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের সক্রিয়তা ধরে রাখা। আমাদের এখানে শিক্ষকদের চাওয়া-পাওয়ার কিছুই নেই।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের অচলাবস্থা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে তিনি বলেন, “আমরা যথেষ্ট দুশ্চিন্তা ও মানসিক হতাশার মধ্যে আছি। আমাদের এই প্রকৌশলীরা পিছিয়ে যাচ্ছে। সমসাময়িক অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পাস করে চাকরির বাজারে ঢুকে যাবে। আমাদের শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়বে। আমরা ক্লাস নেওয়ার জন্য যথেষ্ট উদ্গ্রীব অবস্থায় আছি। সরকারের প্রতি আমাদের বিনীত আবেদন, এই অচলাবস্থা নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হোক।”
চুয়েট কর্মকর্তা সমিতির সভাপতি প্রকৌশলী সৈয়দ মো. ইকরাম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় একটি পরিবারের মতো। শিক্ষার্থীরা যে দাবিতে আন্দোলন করছেন, শিক্ষকেরাও একই দাবিতে কর্মবিরতি পালন করছেন। সেই দাবির প্রতি সংহতি জানিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও কর্মসূচিতে রয়েছেন।
যেভাবে শুরু
গত ২৭ জুলাই চুয়েটের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান বিশ্ববিদ্যালয়ের যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েম। দায়িত্ব নেওয়ার ৫৬ দিনের মাথায় ২১ সেপ্টেম্বর তাঁকে উপাচার্য পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। একই সঙ্গে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) ইলেকট্রনিকস অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে চুয়েটের নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
উপাচার্য পরিবর্তনের এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ওই রাতেই ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। পরে অধ্যাপক সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে শাটডাউন কর্মসূচি ঘোষণা করেন তাঁরা।
২২ সেপ্টেম্বর সকাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটক বন্ধ করে ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জনের পাশাপাশি ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। এরপর থেকে চুয়েটের একাডেমিক কার্যক্রম কার্যত বন্ধ রয়েছে।
২৪ সেপ্টেম্বর বিকেলে অনলাইনে উপাচার্য হিসেবে যোগ দেন অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম। সেদিন তিনি দ্রুত ক্যাম্পাসে যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে পরিস্থিতির সমাধান করতে চান বলে জানান।
একই দিন বিকেলে সংবাদ সম্মেলন করে নতুন উপাচার্যকে চুয়েটে না চাওয়ার কথা জানায় শিক্ষক সমিতি। রাতে নতুন উপাচার্যকে প্রত্যাখ্যান করে মশাল মিছিল করেন শিক্ষার্থীরা।
পরদিন নতুন উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে প্রত্যাখ্যান করে বিক্ষোভ মিছিল করেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। পরে শিক্ষক সমিতি সর্বাত্মক কর্মবিরতির ঘোষণা দেয়। শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সংহতি জানিয়ে কর্মবিরতির ঘোষণা দেয় চুয়েট অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনও।
নতুন উপাচার্যকে ক্যাম্পাসে প্রবেশ ঠেকাতে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকে তালা দিয়ে পালা করে পাহারা দেন। এরপর ‘লাল কার্ড প্রদর্শন’, প্রতিবাদী গ্রাফিতি ও ‘৫৬ কেন’ লেখা কার্ড নিয়ে প্রতীকী প্রশ্নযাত্রাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেন তাঁরা।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, অধ্যাপক সায়েমকে দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় সরিয়ে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হলেও এ সিদ্ধান্তের কারণ প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়নি। এ নিয়ে প্রশ্ন তুলে তাঁরা দ্রুত সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে অধ্যাপক সায়েমকে পুনর্বহালের দাবি জানিয়ে আসছেন।
শিক্ষকদের বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক
চুয়েট শিক্ষক সমিতির সাম্প্রতিক একটি জরুরি সাধারণ সভার আলোচনার অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর শিক্ষকদের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে। ওই আলোচনার একটি বিচ্ছিন্ন অংশের ভিত্তিতে শিক্ষকেরা শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে উসকে দিচ্ছেন বলে দাবি করা হয়।
তবে শিক্ষক সমিতি বলেছে, ২৬ সেপ্টেম্বর রাতে অনুষ্ঠিত প্রায় আড়াই ঘণ্টার অনলাইন সভায় সদস্যদের বিভিন্ন মতামত, উদ্বেগ ও করণীয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সেই আলোচনার একটি বিচ্ছিন্ন বক্তব্যকে সমিতির সামগ্রিক অবস্থান হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক নয়।
এক বিবৃতিতে শিক্ষক সমিতি বলেছে, এ ধরনের প্রচারণায় শিক্ষকেরা সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন। পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট যাচাই করে দায়িত্বশীলভাবে সংবাদ ও মতামত প্রকাশের আহ্বানও জানিয়েছে তারা।
এদিকে টানা সাত দিনের শাটডাউনে চুয়েটের ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ থাকায় একাডেমিক কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। শিক্ষার্থীরা দ্রুত সমস্যার সমাধান করে শিক্ষা কার্যক্রম চালুর দাবি জানাচ্ছেন। অন্যদিকে শিক্ষকরা বলছেন, দীর্ঘ অচলাবস্থার কারণে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ক্ষতি বাড়ছে। সরকারের দ্রুত হস্তক্ষেপের মাধ্যমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
