- নিজস্ব প্রতিবেদক
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) চালু করা শিক্ষক মূল্যায়ন ওয়েবসাইট নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন ছাড়া শিক্ষক মূল্যায়নের পৃথক ব্যবস্থা চালু, মূল্যায়নের ফল প্রকাশ এবং এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনার এখতিয়ার ডাকসুর আছে কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখবে কমিটি।
গত ১০ সেপ্টেম্বর ‘DU Evaluation’ নামে ওয়েবসাইটটি চালু করে ডাকসু। এতে শিক্ষার্থীরা নিজেদের বিভাগের শিক্ষকদের বিভিন্ন বিষয়ে মূল্যায়ন করার সুযোগ পাচ্ছেন। উদ্যোগটি নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আগ্রহ দেখা গেলেও শিক্ষকদের একটি অংশ পদ্ধতি, মূল্যায়নের ফল প্রকাশ এবং ব্যক্তিগত রেটিং নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন।
কয়েক হাজার শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ
ওয়েবসাইট চালুর পর অল্প সময়েই বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী এতে অংশ নেন। রোববার বিকেল পর্যন্ত ৬ হাজার ৪৮৯ শিক্ষার্থী শিক্ষক মূল্যায়ন করেছেন। মোট মূল্যায়নের সংখ্যা ১১ হাজার ছাড়িয়েছে।
একজন শিক্ষার্থী একাধিক শিক্ষককে মূল্যায়ন করতে পারেন। মূল্যায়নে কোর্সের কাঠামো ও সিলেবাস, পাঠদানের পদ্ধতি, যোগাযোগ ও সহযোগিতা, পরীক্ষা ও মূল্যায়ন, পেশাদারত্ব এবং সার্বিক সন্তুষ্টির মতো বিষয় রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া শিক্ষকের পাঠদানের স্বচ্ছতা, আলোচনায় শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে উৎসাহ দেওয়া, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ এবং নিয়মিত ও সময়মতো ক্লাস নেওয়ার বিষয়ও মূল্যায়নের আওতায় রয়েছে।
কীভাবে হবে মূল্যায়ন
ডাকসুর উদ্যোগে ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষ থেকে পরবর্তী ব্যাচের শিক্ষার্থীরা একাডেমিক ই-মেইল ব্যবহার করে নিজেদের বিভাগের শিক্ষকদের মূল্যায়ন করতে পারবেন। একজন শিক্ষার্থী শুধু নিজের বিভাগের শিক্ষকদেরই মূল্যায়ন করতে পারবেন।
মূল্যায়নকারীর পরিচয় গোপন রাখার কথা জানানো হয়েছে। তবে ওয়েবসাইটে শিক্ষকদের নাম ও পরিচয় দেখা যাচ্ছিল। একপর্যায়ে পৃথক শিক্ষকের রেটিংও প্রকাশ করা হয়। পরে সমালোচনার মুখে ব্যক্তিগত রেটিং প্রদর্শন বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর আগে প্রকাশিত কিছু ফল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, পাঁচটির বেশি মূল্যায়ন পাওয়া ৮১৬ শিক্ষকের মধ্যে ৩৪৭ জনের রেটিং ছিল ৪ থেকে ৫-এর মধ্যে। ২০৫ জন পেয়েছেন ৩ থেকে ৪, ১৫৫ জন পেয়েছেন ২ থেকে ৩ এবং ১০৯ জনের রেটিং ছিল ২-এর নিচে।
ডাকসুর বক্তব্য
ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক এস এম ফরহাদ বলেন, শিক্ষক মূল্যায়নের ফলাফল এখনো চূড়ান্ত নয়। ওয়েবসাইটটি পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে এবং এর কার্যক্রম আরও উন্নত করার কাজ চলছে।
তার বক্তব্য, শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনের কথা বিবেচনা করেই উদ্যোগটি নেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিজস্ব শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করলে ডাকসু তাদের উদ্যোগ বন্ধ করে দেবে।
ডাকসুর নির্বাহী সদস্য উম্মে উসওয়াতুন রাফিয়া বলেন, শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। এ বিষয়ে প্রশাসনের সঙ্গে আগে থেকেই যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা না পাওয়ায় ডাকসু নিজস্ব উদ্যোগে ওয়েবসাইট চালু করেছে।
তিনি জানান, কয়েক মাস শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে মূল্যায়ন ও মতামত নেওয়ার পর একটি প্রতিবেদন তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। ওই প্রতিবেদনে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষকদের বিষয়ে শিক্ষার্থীদের মতামত তুলে ধরে তা প্রশাসনের কাছে দেওয়ার কথা ছিল।
শিক্ষকদের বড় অংশের আপত্তি
ডাকসুর শিক্ষক মূল্যায়ন উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে শিক্ষকদের মধ্যে ভিন্নমত থাকলেও পদ্ধতি নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। অনেক শিক্ষক মনে করেন, শিক্ষক মূল্যায়ন করা যেতে পারে; কিন্তু তা শিক্ষার্থীদের সংসদের মাধ্যমে নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব একাডেমিক ব্যবস্থার অধীনে হওয়া উচিত।
শিক্ষকদের আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো ব্যক্তিগত রেটিং প্রকাশ। তাদের মতে, শিক্ষকের কাজের মূল্যায়ন প্রয়োজন হলেও ফলাফল প্রকাশ্যে এনে কোনো শিক্ষককে সামাজিকভাবে হেয় করার সুযোগ তৈরি করা উচিত নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক তারিক মনজুর বলেন, শিক্ষক মূল্যায়ন অবশ্যই গুরুত্ব দিয়ে করা দরকার। তবে এর কিছু অংশ গোপন রাখা প্রয়োজন, যাতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যকার স্বাভাবিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
তিনি আরও বলেন, একজন শিক্ষকের দায়িত্ব শুধু ক্লাস নেওয়া বা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গবেষণা, একাডেমিক কাজসহ নানা দায়িত্বও একজন শিক্ষকের কর্মদক্ষতার অংশ। ফলে শুধু শিক্ষার্থীদের জরিপের ফল দিয়ে একজন শিক্ষকের সামগ্রিক কর্মদক্ষতা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
প্রকাশ্য রেটিং নিয়ে প্রশ্ন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে শিক্ষক মূল্যায়ন করা হয়। তবে সাধারণত ওই মূল্যায়নের ফল শিক্ষক, বিভাগীয় প্রধান, ডিন বা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে থাকে। ব্যক্তিগত ফলাফল প্রকাশ্যে দেওয়ার বিষয়টি প্রচলিত নয়।
তার মতে, মূল্যায়নের ফলাফলকে পেশাগত উন্নয়নের কাজে ব্যবহার করা উচিত। প্রকাশ্য রেটিং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক এবং একাডেমিক পরিবেশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
নিরপেক্ষতা ও পদ্ধতি নিয়েও উদ্বেগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শেহরিন আমিন ভূঁইয়া মোনামি শিক্ষক মূল্যায়নের ধারণার বিরোধিতা করেননি। তিনি জানান, অন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে থাকাকালে এমন মূল্যায়ন ব্যবস্থার অভিজ্ঞতা তার রয়েছে।
তবে তিনি প্রশ্ন তোলেন, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত পরিবেশে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন কতটা নিরপেক্ষ হবে এবং ওই মূল্যায়ন একজন শিক্ষকের সামগ্রিক কর্মদক্ষতার প্রতিনিধিত্ব করে কি না।
তার মতে, শিক্ষক মূল্যায়ন প্রয়োজনীয় হলেও পদ্ধতি সঠিকভাবে তৈরি না হলে এর সুফলের পরিবর্তে নানা ধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে।
শিক্ষক ও গবেষক আসিফ বিন আলীও ডাকসুর উদ্যোগের সমালোচনা করেছেন। তার মতে, শিক্ষক মূল্যায়ন একটি প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া হলেও এটি রাজনৈতিক প্রদর্শন বা ক্ষমতা দেখানোর হাতিয়ার হওয়া উচিত নয়।
তিনি বলেন, একাডেমিক মূল্যায়নে তথ্যের গোপনীয়তা ও পেশাগত মর্যাদা রক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ। মূল্যায়নের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়ন নিশ্চিত করা, কাউকে প্রকাশ্যে হেয় করা নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব নীতিমালা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক মূল্যায়নের নিজস্ব নীতিমালা রয়েছে। ২০২২ সালে এ বিষয়ে নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়। পরে অনলাইনভিত্তিক মূল্যায়ন ব্যবস্থাও তৈরি করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে ৮৪টি বিভাগ ও ১২টি ইনস্টিটিউট রয়েছে। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের সংখ্যা আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষকতার মান, গবেষণা, মূল্যায়ন পদ্ধতি, পক্ষপাতিত্ব ও শিক্ষার্থীদের অভিযোগ জানানোর সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে।
এসব কারণে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে শিক্ষক মূল্যায়নের দাবি দীর্ঘদিনের। ২০২৫ সালের ডাকসু নির্বাচনের আগে শিক্ষার্থীদের একটি অংশের ঘোষণাপত্রেও কার্যকর শিক্ষক মূল্যায়নের প্রতিশ্রুতি ছিল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, নিজস্ব ব্যবস্থায় শিক্ষক মূল্যায়ন কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
অন্য বিশ্ববিদ্যালয় ও বিদেশে কীভাবে হয়
দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যেও শিক্ষক মূল্যায়নের ব্যবস্থা রয়েছে। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে কোর্স শেষে শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে শিক্ষক মূল্যায়ন করা হয়। তবে ব্যক্তিগত মূল্যায়নের ফল শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে থাকে।
বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও শিক্ষার্থীদের মতামত শিক্ষক মূল্যায়নের একটি অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন একজন শিক্ষকের পুনর্নিয়োগসহ বিভিন্ন একাডেমিক সিদ্ধান্তে বিবেচনায় আসতে পারে। তবে এ ধরনের মূল্যায়ন সাধারণত শিক্ষার্থীদের সংগঠন পরিচালনা করে না এবং ব্যক্তিগত ফলাফলও প্রকাশ্যে দেওয়ার প্রচলন নেই।
মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি অব মালায়াও কোর্স শেষে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে শিক্ষক ও কোর্স সম্পর্কে বিস্তারিত মতামত নেয়। সেখানে ব্যক্তিগত মূল্যায়নের ফল সাধারণভাবে প্রকাশ করা হয় না।
বিশ্ববিদ্যালয় বলছে, মূল্যায়ন করবে প্রশাসন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমোজাদ্দিন আলফেজানি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক মূল্যায়নের পক্ষে। তবে শিক্ষক মূল্যায়নের কাজ ডাকসুর এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে না।
তিনি জানান, ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে শিক্ষক মূল্যায়ন চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
উপ-উপাচার্যের ভাষ্য, ডাকসুর চালু করা ব্যবস্থায় শিক্ষকদের ব্যক্তিগত মূল্যায়ন প্রকাশ্যে আসার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এতে শিক্ষকদের সামাজিকভাবে হেয় করার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে এবং এ বিষয়ে অনেক শিক্ষক অভিযোগ করেছেন।
তদন্ত কমিটির আওতায় পুরো বিষয়
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, ডাকসুর শিক্ষক মূল্যায়ন ওয়েবসাইট অনুমোদন ছাড়া চালু করা হয়েছে কি না, এর কার্যক্রম বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, মূল্যায়নের তথ্য কীভাবে সংগ্রহ ও প্রকাশ করা হয়েছে এবং ডাকসুর এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনার এখতিয়ার রয়েছে কি না—এসব বিষয় তদন্ত করা হবে।
এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমোজাদ্দিন আলফেজানিকে প্রধান করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বক্তব্য, শিক্ষক মূল্যায়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক বিষয়। তাই এর জন্য প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালা, নিরপেক্ষ পদ্ধতি এবং শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা ও তথ্যের গোপনীয়তা নিশ্চিত করা জরুরি। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
