মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠাতে সিন্ডিকেট বন্ধের দাবি

  • নিজস্ব প্রতিবেদক

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় ও নানা ধরনের হয়রানি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন রাজনৈতিক নেতা ও বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, বিদেশগামী কর্মীদের কাছ থেকে নির্ধারিত খরচের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের কারণে অনেক শ্রমিক বিদেশে গিয়েও দীর্ঘদিন ঋণের বোঝা থেকে মুক্ত হতে পারেন না।

সোমবার রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) মিলনায়তনে ‘মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানি: ফের সিন্ডিকেট! অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়! বাড়তি ফি ও অর্থ পাচারের ফাঁদে অসহায় বিদেশগামী নাগরিক’ শীর্ষক মুক্ত আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন। আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) এ আলোচনার আয়োজন করে।

রেমিট্যান্স পাঠালেও প্রবাসীরা অবহেলিত

আলোচনায় ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান আবু আহমেদ বলেন, প্রবাসী বাংলাদেশিরা বছরে প্রায় ৩৬ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠান। দেশের অর্থনীতিতে এই অর্থের গুরুত্ব অনেক হলেও যারা এই অর্থ পাঠাচ্ছেন, তাঁদের জীবনযাপন ও কর্মপরিবেশ নিয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না।

তিনি প্রবাসীদের সেবা নিশ্চিত করতে দূতাবাস ও হাইকমিশনগুলোকে আরও জনবান্ধব করার আহ্বান জানান। পাশাপাশি বিমানবন্দরে প্রবাসী শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের হয়রানি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি করেন।

অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়ে ঋণের বোঝা

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, বিদেশে যাওয়ার আগে অতিরিক্ত অর্থ খরচ করতে গিয়ে অনেক শ্রমিক বড় অঙ্কের ঋণগ্রস্ত হন। বিদেশে গিয়ে কয়েক বছর কাজ করেও অনেকের পক্ষে সেই ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব হয় না।

তিনি বলেন, শ্রমিক পাঠানোর ব্যবসায় তাঁদের উপার্জনের কতটুকু অর্থ যৌক্তিকভাবে নেওয়া হবে, তা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শ্রমবাজার ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন এনে কর্মীদের অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়ের চাপ থেকে মুক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে।

রিপন আরও বলেন, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের একটি অংশ ধনী পরিবারের সন্তানদের বিদেশে পড়াশোনার ব্যয়ে দেশ থেকে বেরিয়ে যায়। বিদেশে পড়াশোনার জন্য নেওয়া অর্থের একটি নির্দিষ্ট অংশ দেশে ফেরত আনার বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে।

সব যোগ্য এজেন্সিকে সুযোগ দেওয়ার দাবি

এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, সরকার যাচাই-বাছাই করে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে লাইসেন্স দেয়। তাহলে লাইসেন্সপ্রাপ্ত এসব প্রতিষ্ঠানকে বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে সরাসরি কাজের সুযোগ দেওয়া হবে না কেন—সে প্রশ্ন তোলেন তিনি।

নির্দিষ্ট কয়েকটি এজেন্সির মধ্যে কর্মী পাঠানোর সুযোগ সীমাবদ্ধ না রেখে যোগ্য ও সক্ষম সব লাইসেন্সপ্রাপ্ত এজেন্সিকে সমান সুযোগ দেওয়ার দাবি জানান তিনি।

‘শ্রমিককে পণ্য হিসেবে দেখা হচ্ছে’

এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ অভিযোগ করেন, রাষ্ট্র শ্রমিকদের মানুষ হিসেবে বিবেচনা না করে অনেক ক্ষেত্রে পণ্য হিসেবে বিবেচনা করছে। কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে সিন্ডিকেটের প্রভাব পুরো শ্রমবাজারকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

যেসব দাবি উঠেছে

আলোচনায় এবি পার্টির পক্ষ থেকে বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে কয়েকটি দাবি তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে—

– কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা সিন্ডিকেটকে শ্রমবাজার নিয়ন্ত্রণের সুযোগ না দেওয়া;
– যোগ্য ও সক্ষম সব রিক্রুটিং এজেন্সিকে সমান সুযোগ দেওয়া;
– সরকার নির্ধারিত অভিবাসন ব্যয়ের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া বন্ধ করা;
– কর্মী পাঠানোর সব আর্থিক লেনদেন ব্যাংক বা অনুমোদিত ডিজিটাল মাধ্যমে সম্পন্ন করা;
– দালাল ও সাব-এজেন্টদের নিবন্ধন, নজরদারি ও জবাবদিহির আওতায় আনা;
– রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে কতজন কর্মী বিদেশে যাচ্ছেন এবং তাঁদের কাছ থেকে কত টাকা নেওয়া হচ্ছে, সেই তথ্য প্রকাশ করা;
– প্রতারণা বা হয়রানির অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল ও কালো তালিকাভুক্ত করা এবং আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া।

বক্তারা বলেন, বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগকে কেন্দ্র করে কোনোভাবেই যেন শ্রমিকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় বা হয়রানি করা না হয়, সে জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে কঠোর নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।