জিন্নাহর ছবি থেকে শিক্ষক মূল্যায়ন, ডাকসুর একাধিক উদ্যোগে তীব্র বিতর্ক

  • নিজস্ব প্রতিবেদক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ঘিরে একের পর এক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সংস্কার করা সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর তিনটি ছবি প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। প্রতিবাদে এক শিক্ষার্থী ছবিগুলো ছিঁড়ে ফেলেছেন। পরে আরেক দল শিক্ষার্থী সেখানে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী হিসেবে পরিচিত গোলাম আযমকে জুতাপেটার একটি ছবি টানিয়ে দেয়। একই সময়ে ডাকসুর চালু করা শিক্ষক মূল্যায়ন ওয়েবসাইট নিয়েও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বড় অংশের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

সোমবার দুপুর আড়াইটার দিকে ডাকসু সংগ্রহশালায় গিয়ে জিন্নাহর তিনটি ছবি ছিঁড়ে ফেলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী আবু তৈয়ব হাবিলদার। তিনি ২০০১-০২ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন এবং সর্বশেষ ডাকসু নির্বাচনে সহসভাপতি (ভিপি) পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।

ছবি ছেঁড়ার পর আবু তৈয়ব বলেন, বাংলা ভাষার বিরোধিতা করা এবং ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে অবস্থান নেওয়া জিন্নাহকে ডাকসুর সংগ্রহশালায় জায়গা দেওয়া উচিত নয়। তাঁর দাবি, বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো ব্যক্তিকে নায়ক হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ দেওয়া যাবে না।

জিন্নাহর ছবি ঘিরে পাল্টাপাল্টি প্রতিবাদ

সংস্কারের পর রোববার ডাকসু সংগ্রহশালাটি পুনরায় চালু করা হয়। সেখানে নতুন করে জিন্নাহর তিনটি ছবি প্রদর্শন করা হয়। একটি ছবিতে ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে তাঁর বক্তব্যের দৃশ্য রয়েছে। ওই বক্তব্যে তিনি পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন।

অন্য একটি ছবিতে ১৯৪০ সালের লাহোরে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সম্মেলনের দৃশ্য এবং তৃতীয়টিতে ১৯৭০ সালের নির্বাচন নিয়ে প্রকাশিত একটি সংবাদপত্রের প্রতিবেদন রয়েছে।

জিন্নাহর ছবি যুক্ত হওয়ার পর শিক্ষার্থীদের একটি অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাঁদের বক্তব্য, ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতার সংগ্রামের ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ব্যক্তিকে ডাকসুর সংগ্রহশালায় এমনভাবে উপস্থাপন করা ঐতিহাসিক বাস্তবতার সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ।

এর মধ্যেই সোমবার বিকেল ৩টার দিকে বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার একদল নেতা-কর্মী সংগ্রহশালায় গিয়ে জিন্নাহর ছবির স্থানে ১৯৮১ সালে বায়তুল মোকাররমে গোলাম আযমকে জুতাপেটার একটি ছবি টানিয়ে দেন। সংগঠনের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক অর্ক বড়ুয়ার নেতৃত্বে এ কর্মসূচি হয়।

অর্ক বড়ুয়া বলেন, ডাকসু কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠীর একক সম্পত্তি নয়। ইতিহাসকে একতরফাভাবে তুলে ধরার প্রতিবাদেই তাঁরা ওই ছবি টানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, মুক্তিযুদ্ধের সময় গোলাম আযমের ভূমিকার সঙ্গে পরবর্তী সময়ে তাঁকে জুতাপেটা করার ঘটনাটিও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অংশ।

বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের প্রতিবাদ

জিন্নাহর ছবি প্রদর্শন নিয়ে ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যেও প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল এক বিবৃতিতে ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনের প্রতিবাদ জানিয়েছে। সংগঠনটির দাবি, ভাষা আন্দোলন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিকভাবে জিন্নাহর ছবি প্রদর্শন করা হয়েছে। ছবিটি সরিয়ে ডাকসুকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রচারের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার না করার আহ্বান জানিয়েছে তারা।

বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নও জিন্নাহর ছবি যুক্ত করা এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি অপসারণের প্রতিবাদ জানিয়েছে। সংগঠনটির বক্তব্য, স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি সরিয়ে দেওয়া ইতিহাসের বিকৃত উপস্থাপনের শামিল। দ্রুত জিন্নাহর ছবি অপসারণ এবং শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

শিক্ষক মূল্যায়ন নিয়ে শিক্ষকদের ক্ষোভ

সংগ্রহশালা নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি শিক্ষক মূল্যায়নের জন্য ডাকসুর চালু করা ওয়েবসাইটও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও প্রশাসনের মধ্যে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

‘ডিইউ ইভাল্যুয়েশন’ নামে ওয়েবসাইটটি ১০ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা হয়। এতে শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের পাঠদানের মান, কোর্সের কাঠামো, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ, পরীক্ষা ও মূল্যায়ন, পেশাদারিত্ব এবং সার্বিক সন্তুষ্টিসহ বিভিন্ন বিষয়ে মতামত দিতে পারছেন।

রোববার বিকেল পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ছয় হাজার শিক্ষার্থী এতে অংশ নিয়ে ১১ হাজারের বেশি মূল্যায়ন দিয়েছেন। একজন শিক্ষার্থী একাধিক শিক্ষককে মূল্যায়ন করতে পারছেন। তবে মূল্যায়ন করতে একাডেমিক ই-মেইল দিয়ে নিবন্ধন করতে হচ্ছে এবং শিক্ষার্থীরা মূলত নিজেদের বিভাগের শিক্ষকদের মূল্যায়ন করতে পারছেন।

ডাকসুর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মূল্যায়নকারীর পরিচয় গোপন রাখা হচ্ছে। তিন মাসের মতামত ও মূল্যায়ন বিশ্লেষণ করে একটি প্রতিবেদন তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। পরে সেটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে দেওয়ার কথা।

কিন্তু ওয়েবসাইটে শিক্ষকদের ব্যক্তিগত রেটিং প্রকাশ পাওয়ার পর পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। বিভিন্ন শিক্ষকের নম্বর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং কয়েকজন শিক্ষক ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের শিকার হন। পরে সমালোচনার মুখে ব্যক্তিগত রেটিং দেখার ব্যবস্থা বন্ধ করা হলেও এর আগেই অনেক তথ্য অনলাইনে ছড়িয়ে যায়।

‘মূল্যায়ন হবে, তবে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে’

শিক্ষকদের বড় অংশের আপত্তি মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে। তাঁদের বক্তব্য, শিক্ষার্থীদের মতামতের ভিত্তিতে শিক্ষক মূল্যায়ন করা যেতে পারে। তবে সেটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাঠামোর মধ্যে, নির্দিষ্ট নীতিমালা অনুযায়ী এবং গোপনীয়তা বজায় রেখে করা প্রয়োজন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক তারিক মনজুরের মতে, শিক্ষক মূল্যায়ন সতর্কতার সঙ্গে পরিচালনা করা উচিত। মূল্যায়নের কিছু তথ্য গোপন না রাখলে ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাঁর মতে, একজন শিক্ষকের কাজ শুধু ক্লাস নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; গবেষণা ও অন্যান্য একাডেমিক দায়িত্বও থাকে। ফলে একটি অনলাইন জরিপ দিয়ে শিক্ষকের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়।

শিক্ষকদের আরও প্রশ্ন, নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত না থাকা শিক্ষার্থীও মূল্যায়নে অংশ নিতে পারছেন কি না, কিংবা কোনো শিক্ষককে যাঁর কোর্স নেওয়ার সুযোগ হয়নি, তিনি কীভাবে ওই শিক্ষককে মূল্যায়ন করবেন। এসব কারণে মূল্যায়নের প্রতিনিধিত্ব ও নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, আন্তর্জাতিকভাবে শিক্ষক মূল্যায়নের প্রচলন থাকলেও সাধারণত এর ফল শিক্ষার্থী বা সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করা হয় না। সংশ্লিষ্ট শিক্ষক, বিভাগীয় কর্তৃপক্ষ বা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রয়োজন অনুযায়ী তা ব্যবহার করে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ব্যবস্থাও ছিল

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক মূল্যায়নের উদ্যোগ ডাকসুর মাধ্যমে প্রথম শুরু হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারনাল কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স সেলের উদ্যোগে এ বিষয়ে আগে থেকেই কাজ হয়েছে।

২০২২ সালে শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতির নীতিমালা তৈরি করা হয়। পরবর্তী সময়ে লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নের সুযোগ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২৪ সালের শুরুতে অন্তত ১৪টি বিভাগে এ ব্যবস্থা চালু হয়েছিল। পরে সব বিভাগে একযোগে চালুর পরিকল্পনা আর বাস্তবায়িত হয়নি।

ডাকসুর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীদের চাহিদার ভিত্তিতেই নতুন ওয়েবসাইট চালু করা হয়েছে। ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য উম্মে উসওয়াতুন রাফিয়া দাবি করেছেন, বিষয়টি নিয়ে তিনি দীর্ঘদিন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সহযোগিতা চাইলেও পর্যাপ্ত সহায়তা পাননি।

ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক এস এম ফরহাদ বলেন, ওয়েবসাইটের মূল্যায়ন এখনো চূড়ান্ত নয়। এটি পরীক্ষামূলকভাবে পরিচালিত হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করলে ডাকসুর উদ্যোগ বন্ধ করে দেওয়া হবে।

প্রশাসনের আপত্তি

ডাকসুর শিক্ষক মূল্যায়ন উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও আপত্তি জানিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক মূল্যায়নের পক্ষে থাকলেও এ কাজ ডাকসুর এখতিয়ারভুক্ত নয়।

তিনি জানান, ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় শিক্ষার্থীদের শিক্ষক মূল্যায়নের সুযোগ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সহ-উপাচার্যের ভাষ্য, ডাকসুর ওয়েবসাইট চালুর পর অনেক শিক্ষক প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করেছেন। ব্যক্তিগত রেটিং প্রকাশের ফলে শিক্ষকদের সামাজিকভাবে হেয় করার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।