- নিজস্ব প্রতিবেদক
সরকারি চাকরির ১১ থেকে ২০তম গ্রেডে নিয়োগের ক্ষেত্রে মৌখিক পরীক্ষার (ভাইভা) নম্বর বাড়ানোর প্রস্তাবের প্রতিবাদে কুমিল্লা, রাজশাহী ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেছেন শিক্ষার্থীরা। তাঁদের অভিযোগ, ভাইভার নম্বর বাড়ানো হলে মেধার মূল্যায়ন কমে গিয়ে রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হতে পারে। এ সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা না করলে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তাঁরা।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের গোলচত্বরে মানববন্ধন করেন শিক্ষার্থীরা। এর আগে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং রাতে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
কর্মসূচিগুলোতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীরাও অংশ নেন। এ সময় ‘কোটা গেছে যেই পথে, ভাইভা যাবে সেই পথে’, ‘ভাইভার নামে দলীয়করণ, বন্ধ কর, করতে হবে’, ‘ভাইভা না মেধা, মেধা মেধা’, ‘মামা-খালুর সুপারিশ, চলবে না চলবে না’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন শিক্ষার্থীরা।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মানববন্ধনে আইন বিভাগের শিক্ষার্থী বায়েজিদ হোসেন বলেন, কোটা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন শুরু হয়েছিল, ভাইভার নম্বর বাড়ানোর মাধ্যমে সেই বৈষম্য আবার ফিরিয়ে আনার চেষ্টা হচ্ছে। সরকারি চাকরিতে দলীয়করণ ও ভাইভার নামে কোটার সুযোগ তৈরি করা হলে শিক্ষার্থীরা তা মেনে নেবেন না।
জাতীয় ছাত্রশক্তির কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সদস্যসচিব সৈয়দা নাজিফা নাফিল বলেন, তাঁরা সব সময় মেধার ভিত্তিতে সরকারি চাকরিতে নিয়োগের দাবি জানিয়ে আসছেন। ভাইভার নম্বর বাড়ানোর প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে নতুন করে বৈষম্য তৈরির আশঙ্কা রয়েছে। এ ধরনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে প্রতিরোধ গড়ে তোলা প্রয়োজন।
ফার্মেসি বিভাগের শিক্ষার্থী নাঈম ভূঁইয়া বলেন, জনগণের জন্য কাজ করার কথা যে সরকারের, তাদের এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে শিক্ষার্থীদের আবার রাজপথে নামতে হচ্ছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে দলীয়করণের প্রবণতা বন্ধ না হলে নতুন করে বৈষম্যের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি সাইফুল ইসলাম বলেন, ভাইভার নম্বর বাড়ানোর ফলে মেধাবী শিক্ষার্থীদের চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের দ্বারস্থ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। তাই প্রস্তাবটি প্রত্যাহার করে মেধার যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি। অন্যথায় আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও একই দাবিতে মঙ্গলবার সন্ধ্যা সোয়া সাতটার দিকে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন শিক্ষার্থীরা। মিছিলটি ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে আবার গ্রন্থাগারের সামনে এসে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে মিলিত হয়।
সমাবেশে শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, কোটাবিরোধী আন্দোলনের পর এবার ভাইভার মাধ্যমে একই ধরনের বৈষম্যের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। তাঁদের দাবি, লিখিত পরীক্ষায় মেধার ভিত্তিতে উত্তীর্ণ হওয়ার পর ভাইভায় অতিরিক্ত নম্বরের সুযোগ থাকলে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হেলাল উদ্দিন বলেন, কোটার বিরুদ্ধে আন্দোলনের পর এবার ভাইভা নামের কোটা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীবান্ধব সিদ্ধান্ত না এলে তাঁরা আরও কঠোর কর্মসূচিতে যাবেন।
আরেক শিক্ষার্থী আসাদুজ্জামান নূর বলেন, মৌখিক পরীক্ষায় অতিরিক্ত নম্বর রাখলে দক্ষ ও মেধাবী প্রার্থীদের যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে না। বিধিমালা চূড়ান্ত হওয়ার আগেই সরকারকে এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার আহ্বান জানান তিনি।
এদিকে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়েও মঙ্গলবার রাত ১০টার দিকে জিয়া মোড় থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন শিক্ষার্থীরা। মিছিলটি ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে প্রধান ফটকে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মী ও শিক্ষার্থীরা বক্তব্য দেন।
সমাবেশে শিক্ষার্থীরা বলেন, ভাইভার নম্বর বাড়ানো হলে লিখিত পরীক্ষায় ভালো করা মেধাবী প্রার্থীরাও নিয়োগ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। একই সঙ্গে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির সুযোগ বাড়তে পারে।
শিক্ষার্থী রফিক আল হাসান বলেন, ১১ থেকে ২০তম গ্রেডে নিয়োগ পাওয়া কর্মীরা সরকারি সেবার বিভিন্ন পর্যায়ে সরাসরি দায়িত্ব পালন করেন। এ পর্যায়ে অনিয়মের মাধ্যমে অযোগ্য বা দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা নিয়োগ পেলে এর প্রভাব রাষ্ট্রের ওপর পড়তে পারে। তাই সরকারকে সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা করতে হবে।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশক্তির সদস্যসচিব ইফতেহার উদ্দিন অভিযোগ করেন, ভাইভার নম্বর বাড়ানোর মাধ্যমে স্বজনপ্রীতির সুযোগ তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে শাখা ছাত্রশিবিরের ছাত্র অধিকার সম্পাদক নাহিদ হাসান দাবি করেন, প্রস্তাবটি প্রত্যাহার না করা হলে ক্যাম্পাসে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।
কী আছে প্রস্তাবিত বিধিমালায়
সম্প্রতি সরকারি চাকরির ১১ থেকে ২০তম গ্রেডে নিয়োগের ক্ষেত্রে লিখিত পরীক্ষার পাস নম্বর কমানো এবং মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়ানোর বিষয়ে বিধিমালা পরিবর্তনের প্রস্তাব সামনে এসেছে।
বর্তমানে ১১ থেকে ১২তম গ্রেডের চাকরিতে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর ১০। প্রস্তাবিত বিধিমালায় তা বাড়িয়ে ৫০ করার কথা বলা হয়েছে। ১৩ থেকে ১৬তম গ্রেডে বর্তমানে ভাইভার নম্বর ১০ থাকলেও প্রস্তাবে তা ৪০ করার কথা বলা হয়েছে। আর ১৭ থেকে ২০তম গ্রেডে ভাইভার নম্বর ১০ থেকে বাড়িয়ে ২৫ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য বা বৈষম্য তৈরির জন্য নয়, দক্ষ ও যোগ্য প্রশাসনিক জনবল নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই নিয়োগবিধিতে পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে শিক্ষার্থীদের দাবি, ভাইভার নম্বর উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হলে লিখিত পরীক্ষায় মেধার ভিত্তিতে এগিয়ে থাকা প্রার্থীদের ফলাফল পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হবে। তাই বিধিমালা চূড়ান্ত করার আগে শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীদের উদ্বেগ বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
শিক্ষার্থীরা বলছেন, মেধাভিত্তিক ও স্বচ্ছ নিয়োগপ্রক্রিয়া নিশ্চিত করাই তাঁদের মূল দাবি। ভাইভার নম্বর বাড়ানোর প্রস্তাব প্রত্যাহার না হলে ধারাবাহিক কর্মসূচির মাধ্যমে আন্দোলন আরও জোরদার করা হবে।
