অথৈ আত্মহত্যা: প্রেমিকের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) সংগীত বিভাগের শিক্ষার্থী প্রত্যাশা মজুমদার অথৈয়ের আত্মহত্যার ঘটনায় তার প্রেমিক ইয়াছিন মজুমদারের বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেছে পুলিশ। তদন্ত কর্মকর্তার অভিযোগ, ইয়াছিনের ধারাবাহিক মানসিক নিপীড়নের কারণে আত্মহননের পথ বেছে নেন অথৈ।

তবে অভিযোগপত্র দাখিলের পর ইয়াছিন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন বলে দাবি করেছেন তার আইনজীবী। আসামিপক্ষের দাবি, ইয়াছিন গুরুতর অসুস্থ ছিলেন এবং তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সঠিক নয়।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সূত্রাপুর থানার এসআই আলমগীর হোসেন তদন্ত শেষে গত ১৯ মে ঢাকার আদালতে ইয়াছিনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দেন। গত ১৪ জুলাই ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসান শাহাদাত অভিযোগপত্র গ্রহণ করেন এবং মামলাটি বিচারের জন্য প্রস্তুত হওয়ায় সংশ্লিষ্ট আদালতে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৯ এপ্রিল রাজধানীর সূত্রাপুরের লক্ষ্মীবাজারের নন্দলাল লেনের একটি বাসায় গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী প্রত্যাশা মজুমদার অথৈ। পরদিন তার বাবা প্রণব মজুমদার সূত্রাপুর থানায় ইয়াছিন মজুমদারের বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা করেন।

মামলার পরদিনই লালবাগ এলাকার ‘জমিদারি ভোজ’ রেস্তোরাঁ থেকে ইয়াছিনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে কয়েক মাস কারাভোগের পর তিনি জামিনে মুক্তি পান। তবে আদালতে নিয়মিত হাজির না হওয়ায় গত ২৬ এপ্রিল তার জামিন বাতিল করে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়।

তদন্ত কর্মকর্তার অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, অথৈ ও ইয়াছিনের বাড়ি পাশাপাশি এলাকায়। তারা চট্টগ্রামের একই স্কুলে পড়াশোনা করতেন। ইয়াছিন বিভিন্ন সময় অথৈকে প্রেমের প্রস্তাব দিলেও শুরুতে তিনি সাড়া দেননি। পরে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ঢাকায় আসার পর তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, সম্পর্ক হওয়ার পর মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের যোগাযোগ চলত। তবে একপর্যায়ে ইয়াছিন অথৈকে অপমানজনক কথাবার্তা, অপবাদ ও বিভিন্নভাবে মানসিক চাপ দিতেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

পুলিশের অভিযোগ অনুযায়ী, ঘটনার দিন ২৯ এপ্রিল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত উৎসবের অনুশীলন শেষে মেসে ফিরছিলেন অথৈ। মেসের গেটের সামনে আগে থেকে অবস্থান করা ইয়াছিন তাকে সংগীত উৎসবে অংশ নেওয়া থেকে বিরত থাকতে বলেন। এ সময় তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয় এবং ইয়াছিন তাকে গালাগাল ও অপমানজনক কথা বলেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আলমগীর হোসেন বলেন, ইয়াছিনের আচরণ ও মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে ওই দিন বিকাল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে কোনো একসময় অথৈ আত্মহত্যা করেন বলে তদন্তে পাওয়া গেছে।

তিনি বলেন, “মামলার তদন্ত শেষে আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র আদালতে দেওয়া হয়েছে। ভিকটিমের মনের কথা জানা সম্ভব নয়, তবে তার পরিবারের অভিযোগ এবং তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অভিযোগপত্র প্রস্তুত করা হয়েছে।”

অথৈয়ের বাবা প্রণব মজুমদার বলেন, মেয়েকে নিয়ে তার অনেক স্বপ্ন ছিল। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করার পর তাকে ভারতের রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য পাঠানোর পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি।

তিনি বলেন, “মেয়েকে হারানোর কষ্ট একজন বাবা ছাড়া কেউ বুঝতে পারে না। আমি যার কারণে মেয়েকে হারিয়েছি, তার বিচার চাই।”

অথৈয়ের চাচাতো ভাই সুমন কুমার বলেন, ঘটনার দিন তাদের পরিবারের একটি বিয়ের অনুষ্ঠান ছিল। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের অনুশীলনের কারণে অথৈ যেতে পারবে না বলে জানিয়েছিল। তিনি বলেন, এত অল্প সময়ের মধ্যে কী ঘটেছিল, তা জানার জন্যই তারা আইনের আশ্রয় নিয়েছেন।

বাদীপক্ষের আইনজীবী সুমন কুমার রায় দাবি করেন, ইয়াছিনের মানসিক নির্যাতনের কারণে অথৈ আত্মহত্যা করেছেন। তিনি বলেন, সিআইডির ফরেনসিক পরীক্ষায় ইয়াছিনের মোবাইল ফোনে অথৈয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি ব্যক্তিগত ছবি পাওয়া গেছে বলে তারা জানতে পেরেছেন। ওই ছবি ব্যবহার করে ভয় দেখানো ও মানসিক চাপ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

তবে এ বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন বলেন, তদন্তে এমন কোনো বিষয় পাওয়া যায়নি।

আসামিপক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ আবু বক্কর ছিদ্দিক বলেন, ইয়াছিন দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন। কয়েক দিন আগে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তার মৃত্যু হয়েছে বলে পরিবার জানিয়েছে।

তিনি বলেন, “ইয়াছিনের শারীরিক অবস্থা ভালো ছিল না। মেডিকেল গ্রাউন্ডে তাকে জামিন দেওয়া হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে আমরা আদালতে আইনি লড়াই করব।”

অথৈয়ের মৃত্যুর ঘটনায় করা মামলায় এখন অভিযোগপত্র গ্রহণের পর বিচারিক কার্যক্রমের পরবর্তী ধাপ শুরু হবে।