- নন্দনষ্টপ্রযুক্তিনির্ভর বাংলাদেশ গড়তে বিনিয়োগ, দক্ষতা উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব বাড়ানোর আহ্বান
সেমিকন্ডাক্টর শিল্পকে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতির অন্যতম সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, প্রযুক্তিনির্ভর, স্বনির্ভর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে এই খাতকে এগিয়ে নিতে সরকার সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত দুই দিনব্যাপী ‘ন্যাশনাল সেমিকন্ডাক্টর সিম্পোজিয়াম এবং বায়োটেকনোলজি, ইলেকট্রনিক্স, এআই অ্যান্ড রোবোটিক্স সামিট’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই আয়োজন কোনো সাধারণ সম্মেলন নয়, বরং আগামীর প্রযুক্তিনির্ভর বাংলাদেশ বিনির্মাণের অন্যতম কারিগরদের মিলনমেলা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশি প্রযুক্তিবিদদের অংশগ্রহণ এই খাতের জন্য অনুপ্রেরণার বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি চতুর্থ ও পঞ্চম শিল্প বিপ্লবের ভিত্তি তৈরি করেছে। এই সময়ে সেমিকন্ডাক্টর শুধু একটি শিল্প নয়, এটি আধুনিক সভ্যতার অন্যতম ভিত্তি।
মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, চিকিৎসা সরঞ্জাম, কৃষি প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স, ডাটা সেন্টার, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, আধুনিক শিল্পকারখানা থেকে শুরু করে মহাকাশ প্রযুক্তি পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই সেমিকন্ডাক্টর বা মাইক্রোচিপের গুরুত্ব অপরিসীম বলে জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বব্যাপী সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিং, বৈদ্যুতিক যানবাহন, স্মার্ট ডিভাইস, ৫জি ও ৬জি যোগাযোগ ব্যবস্থা, ডাটা সেন্টার এবং অটোমেশন প্রযুক্তির কারণে চিপের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে।
তিনি বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর বাজার প্রায় এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। এই বিশাল বাজারে প্রবেশের জন্য বাংলাদেশের সামনে বড় সুযোগ রয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে সেমিকন্ডাক্টর শিল্প থেকে রপ্তানি আয়ের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা অর্জনে বাংলাদেশ সক্ষম হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের তিন হাজারের বেশি সেমিকন্ডাক্টর পেশাজীবী বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, সিঙ্গাপুর ও ইউরোপের বিভিন্ন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, গবেষণা সংস্থা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। এসব বিশ্বমানের দক্ষ জনশক্তিকে দেশের উন্নয়নের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি জানান, বাংলাদেশে ইতোমধ্যে সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন, ভেরিফিকেশন, টেস্টিং, এমবেডেড সিস্টেম, পাওয়ার ইলেকট্রনিক্স এবং অ্যাডভান্সড প্যাকেজিং খাতে কাজ শুরু হয়েছে। দেশের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রবেশ করেছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেমিকন্ডাক্টর খাতকে সরকার জাতীয় অগ্রাধিকার খাত হিসেবে বিবেচনা করছে। তবে এ খাতের উন্নয়ন কোনো একক মন্ত্রণালয় বা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়, এটি একটি সম্মিলিত জাতীয় মিশন।
তিনি জানান, সেমিকন্ডাক্টর শিল্পকে এগিয়ে নিতে চলতি বাজেটে প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে। এ শিল্পের কাঁচামালের ওপর সব ধরনের শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে। পাশাপাশি সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন সার্ভিসের রপ্তানি আয়ের ওপর নগদ প্রণোদনা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এছাড়া নতুন উদ্যোক্তাদের উদ্ভাবন বাস্তবায়নে সরকার প্রথমবারের মতো বছরে ৫০০ কোটি টাকা স্টার্টআপ অনুদান বরাদ্দ রেখেছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের জন্য ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে সরকার বিনিয়োগবান্ধব নীতি, কর সুবিধা, বন্ডেড সুবিধা, বিশেষায়িত অবকাঠামো উন্নয়ন এবং ওয়ান-স্টপ সার্ভিস কার্যকর করার উদ্যোগ নিয়েছে।
বিদ্যমান হাইটেক পার্কগুলোর আধুনিকায়নের পাশাপাশি দেশে একটি বায়োটেক পার্ক নির্মাণের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের সেমিকন্ডাক্টর সম্ভাবনা তুলে ধরতে সম্প্রতি মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রে আয়োজিত রোডশো প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তবে শুধু রোডশো নয়, এর পরবর্তী ধাপে অংশীদারিত্ব, বিনিয়োগ, প্রশিক্ষণ সহযোগিতা এবং রপ্তানি সুযোগ বাস্তবায়নে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, সেমিকন্ডাক্টর খাতে দক্ষতার ঘাটতি, গবেষণাগারের সীমাবদ্ধতা, বিনিয়োগ সংকট এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার মতো চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তবে এসব প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করার সক্ষমতা ও দৃঢ় ইচ্ছা বাংলাদেশের রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, কৃষি, তৈরি পোশাক, প্রবাসী আয় ও ডিজিটাল সেবার মতো খাতগুলোতে বাংলাদেশের সফলতার ধারাবাহিকতায় সেমিকন্ডাক্টর শিল্পও ভবিষ্যতে দেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় সম্ভাবনার ক্ষেত্র হতে পারে।
তিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, সরকারি সংস্থা, বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পখাত, প্রবাসী পেশাজীবী ও উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
দুই দিনব্যাপী এই সামিট থেকে নতুন অংশীদারিত্ব, গবেষণা উদ্যোগ, বিনিয়োগের সুযোগ এবং উদ্ভাবনী চিন্তার বিকাশ ঘটবে বলে আশা প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানের উদ্বোধন ঘোষণা করেন।
