বাংলাদেশি আখ্যা দিয়ে নারীকে পুশব্যাক, আসাম সরকারকে ২ লাখ রুপি ক্ষতিপূরণের নির্দেশ

  • নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশি আখ্যা দিয়ে ভারতীয় এক মুসলিম নারীকে জোর করে বাংলাদেশে পাঠানোর ঘটনায় আসাম সরকারকে ২ লাখ রুপি ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন গুয়াহাটি হাই কোর্ট। আদালত একই সঙ্গে ওই নারীকে বাংলাদেশ থেকে খুঁজে বের করে ভারতে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারকে নির্দেশ দিয়েছেন।

৪৪ বছর বয়সী ওই নারীর নাম মুমতাজ বেগম। তাঁর পরিবারের করা একটি হেবিয়াস কর্পাস আবেদনের শুনানিতে বিষয়টি উঠে আসে। আবেদনের মাধ্যমে আদালতের কাছে মুমতাজকে হাজির করে তাঁর আটকের বৈধতা যাচাইয়ের আবেদন জানানো হয়েছিল।

মামলার শুনানিতে মুমতাজকে বাংলাদেশে পাঠানোর ঘটনায় আসামের নগাঁও ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের ভূমিকা নিয়েও তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন হাই কোর্ট। বিচারপতি কল্যাণ রায় সুরানা ও বিচারপতি সুস্মিতা ফুকন খাউন্দের বেঞ্চের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ট্রাইব্যুনালের নেওয়া পদক্ষেপের মধ্যে আইনের অপপ্রয়োগ ও বিদ্বেষপ্রসূত উদ্দেশ্যের বিষয়টি নথিপত্র থেকেই স্পষ্ট।

মুমতাজ বাংলাভাষী ভারতীয় মুসলিম নারী। ২০১৯ সালে আসামের নগাঁও ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল তাঁকে বাংলাদেশি হিসেবে ঘোষণা করে। ট্রাইব্যুনালের মতে, তিনি তাঁর ভারতীয় নাগরিকত্বের পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি।

পরে ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মুমতাজের পক্ষ থেকে হাই কোর্টে আবেদন করা হলে আদালত ট্রাইব্যুনালকে মামলাটি পুনর্বিবেচনার নির্দেশ দেন। আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল, ট্রাইব্যুনাল মুমতাজের দেওয়া সব তথ্য ও নথি যথাযথভাবে বিবেচনা না করেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

হাই কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী গত ৩০ মে মুমতাজ পুনরায় নগাঁও ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে হাজির হন। তবে মামলাটি পুনর্বিবেচনার পরিবর্তে সেদিন তাঁকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণ থেকেই তাঁকে গ্রেপ্তার করে আসামের মাতিয়া ডিটেনশন সেন্টারে পাঠানো হয়।

মুমতাজের আইনজীবীদের অভিযোগ, তাঁকে গ্রেপ্তার বা ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তের কোনো কপি দেওয়া হয়নি। ফলে ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আইনগত প্রতিকার নেওয়ার সুযোগও তিনি পাননি।

পরবর্তীতে ১৪ জুন আসামের কাছাড় জেলার সীমান্ত দিয়ে মুমতাজকে বাংলাদেশে পুশব্যাক করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

মুমতাজের পরিবার পরে গুয়াহাটি হাই কোর্টে হেবিয়াস কর্পাস পিটিশন দায়ের করে জানতে পারে, তাঁকে ভারতের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। এরপর আদালত মামলায় ভারতের কেন্দ্রীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে পক্ষভুক্ত করেন এবং বাংলাদেশে মুমতাজকে খুঁজে বের করে তাঁকে ভারতে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনীয় চেষ্টা চালানোর নির্দেশ দেন।

এ ঘটনায় আসাম সরকারের কাছ থেকে ২ লাখ রুপি ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশও এসেছে। ভারত থেকে কাউকে বাংলাদেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে ডিপোর্টেশন-সংক্রান্ত নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগে কোনো রাজ্য সরকারকে ক্ষতিপূরণ বা আদালতের খরচ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

আসামের ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালগুলো নাগরিকত্বসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য গঠিত বিশেষ আধা-বিচারিক প্রতিষ্ঠান। গত কয়েক বছরে এসব ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম নিয়ে বিভিন্ন সময় প্রশ্ন উঠেছে। উচ্চ আদালতও একাধিক মামলায় ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তকে স্বেচ্ছাচারী এবং দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বৈষম্যমূলক হওয়ার অভিযোগে সমালোচনা করেছেন।

তবে গুয়াহাটি হাই কোর্টের সর্বশেষ এই রায় ঠিক কোন তারিখে দেওয়া হয়েছে এবং কত দিনের মধ্যে মুমতাজকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা, সে বিষয়ে প্রতিবেদনে বিস্তারিত জানানো হয়নি। একইভাবে বাংলাদেশে পাঠানোর পর মুমতাজকে ইতোমধ্যে ভারতে ফিরিয়ে আনা হয়েছে কি না, সেটিও স্পষ্ট নয়।