হিমবাহ ধসে নেপালে ভয়াবহ হড়পা বান, মৃত ৭৮১, নিখোঁজ ৩ হাজারের বেশি

  • ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক

নেপাল ও তিব্বতের সীমান্তবর্তী হিমালয় এলাকায় ভয়াবহ হড়পা বানে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৭৮১ জনে দাঁড়িয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন অন্তত ২ হাজার ৫০২ জন। একই ঘটনায় চীনের অংশে আরও ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৫৪৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছে জিরং কাউন্টি কর্তৃপক্ষ।

রেডক্রসের হিসাব অনুযায়ী, এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৯০ হাজারের বেশি মানুষ। ভয়াবহ এই বিপর্যয়ের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের যোগসূত্র রয়েছে বলে জানিয়েছে চীন।

তবে ঠিক কী কারণে পাহাড়ের ওপর থেকে বিপুল পরিমাণ পানি, বরফ ও ধ্বংসাবশেষ একসঙ্গে নিচে নেমে এলো, তা নিয়ে চলছে বিশ্লেষণ। পর্বতারোহী সঞ্জিত সিং বালসাইদের মতে, ঘটনাটির পেছনে হিমবাহ ধস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

তার ধারণা, প্রায় এক কিলোমিটার বিস্তৃত হিমবাহের একটি বড় অংশ প্রায় ৫ হাজার মিটার উচ্চতা থেকে ভেঙে নিচের দিকে ধসে পড়ে। পথে এটি কয়েকটি হ্রদের সংস্পর্শে আসার পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ পাথর, মাটি ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ সঙ্গে নিয়ে প্রবাহিত হয়।

বালসাইদ বলেন, তিব্বতের সীমান্তবর্তী এলাকায় পৌঁছানোর সময় এই প্রবাহ প্রায় ৩ হাজার মিটার উঁচু খাড়া ঢাল বেয়ে নেমে আসে। সরু গিরিখাতের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় পানির সঙ্গে বরফ, হ্রদের পানি ও ধ্বংসাবশেষের সম্মিলিত শক্তি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়।

হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহ ও পর্বত গবেষক ধনঞ্জয় রেগমির মতে, এই সম্মিলিত জলপ্রবাহের গতি ঘণ্টায় প্রায় ৩০০ কিলোমিটারে পৌঁছেছিল। আগের ধারণার তুলনায় এ গতি অনেক বেশি। পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে ওই এলাকায় নতুন করে তিনটি হ্রদের সৃষ্টি।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, পর্বতে আবারও বড় ধরনের পাথরধস হলে তিনটি হ্রদের ওপর ধারাবাহিক প্রভাব পড়তে পারে। এতে নতুন করে ভয়াবহ বন্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় তিনটি হ্রদের পানি নিয়ন্ত্রিতভাবে বের করে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে এখন পর্যন্ত এ ধরনের কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হ্রদের পানি নিয়ন্ত্রিতভাবে সরিয়ে না নেওয়া পর্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষকে নিরাপদ ও উঁচু স্থানে সরিয়ে রাখা জরুরি। সম্ভাব্য নতুন বিপর্যয় মোকাবিলায় আগাম সতর্কতাও জোরদার করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

এদিকে, এই বিপর্যয়ের সঙ্গে বৈশ্বিক উষ্ণতার সম্পর্ক কতটা, তা নিয়েও আলোচনা চলছে। হিমালয় অঞ্চলের পর্বত ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ আশুতোষ মিশ্র জানান, প্রথমদিকে ধারণা করা হয়েছিল কোনো একটি হ্রদে ফাটল বা ভূমিধসের কারণে পানির এই বিশাল প্রবাহ তৈরি হয়েছে।

তবে পরে পাওয়া তথ্য ও উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণে সেই ধারণা পাল্টে যায়। জানা যায়, হ্রদগুলো এই বিপর্যয়ের মূল উৎস ছিল না।

উপগ্রহচিত্রে দেখা গেছে, নেপাল-তিব্বত সীমান্তের প্রায় ৭ হাজার মিটার উচ্চতার লাংতাং লিরুং পর্বতশৃঙ্গের উত্তর পাশের একটি হিমবাহের প্রায় ২ বর্গকিলোমিটার অংশ ধসে পড়ে। সেখান থেকেই বিপুল পরিমাণ বরফ, পানি ও ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ সৃষ্টি হয়ে ভয়াবহ হড়পা বানের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এ ঘটনায় একদিকে প্রাণহানি ও নিখোঁজের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে নতুন হ্রদ তৈরি হওয়ায় ভবিষ্যতে আরও বড় বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে দুর্গত এলাকায় উদ্ধার তৎপরতার পাশাপাশি সম্ভাব্য নতুন বন্যা মোকাবিলায় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।