- নিজস্ব প্রতিবেদক
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সংক্রান্ত দুটি বিলের প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি জানিয়ে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠক বর্জন করেছেন বিরোধী দলের সদস্যরা। তাদের অভিযোগ, অংশীজনদের মতামত যথাযথভাবে না নিয়ে এবং পর্যাপ্ত সময় না দিয়েই গুরুত্বপূর্ণ দুটি আইন সংসদে পাসের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
রোববার (৩০ আগস্ট) জাতীয় সংসদ ভবনে পৃথক দুটি সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ ঘটনা ঘটে। বিরোধী সদস্যদের দাবি, বিল দুটি পর্যালোচনার ক্ষেত্রে তাদের কার্যকর অংশগ্রহণের সুযোগ রাখা হয়নি। ফলে সংসদীয় কমিটির কাজও অনেকটা আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে।
গুম প্রতিরোধ বিল নিয়ে স্বরাষ্ট্র কমিটিতে বিরোধিতা
রোববার বিকেলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। এ সময় কমিটির দুই বিরোধী সদস্য নূরুল ইসলাম ও আবদুল বাতেন, দুজনই জামায়াতে ইসলামীর, বৈঠক থেকে বেরিয়ে যান।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, শুরুতেই তারা জানান, গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে বিলটি উত্থাপনের প্রতিবাদে তারা অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করেছিলেন। সেই অবস্থানের ধারাবাহিকতায় সংসদীয় কমিটির বৈঠকেও অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা।
তবে বিরোধী সদস্যদের এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন। সংসদ সচিবালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে তার বক্তব্য তুলে ধরে বলা হয়, কোনো সংশোধনী বা ভিন্নমত থাকলে তা কমিটির বৈঠকে উপস্থাপন করে আলোচনা করা উচিত। তার মতে, বৈঠক থেকে ওয়াকআউট সংসদীয় কার্যপ্রণালির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বৈঠকে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা হয়। সেখানে জানানো হয়, গত ছয় মাসে দেশে কোনো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেনি। বিভিন্ন স্থানে ‘মব’ তৈরির চেষ্টা হলেও কোনো রাজনৈতিক নিপীড়নের ঘটনা ঘটেনি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করেনি বলে বৈঠকে উল্লেখ করা হয়।
মিরাজ শেখের অপহরণের ঘটনা নিয়েও আলোচনা হয়। এ প্রসঙ্গে কমিটির পক্ষ থেকে বিষয়টিকে ‘ব্লেম গেম’ বা পরস্পরকে দোষারোপের রাজনীতি হিসেবে অভিহিত করা হয়।
আলোচনা শেষে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ সংসদে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকে কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীনের সভাপতিত্বে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দীন আহমদসহ সংশ্লিষ্ট সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
মানবাধিকার কমিশন বিলেও অংশ নেননি বিরোধীরা
এর আগে রোববার সকালে আইন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল নিয়ে আলোচনা শুরু হলে বিরোধী দলের সদস্যরা এতে অংশ নেননি।
বিরোধীদের অভিযোগ, ভুক্তভোগী, মানবাধিকারকর্মী ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর মতামত যথাযথভাবে বিবেচনায় না নিয়ে সরকার ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ-২০২৫’ বাতিল করেছে। নতুন করে আরও শক্তিশালী আইন করার কথা বলা হলেও প্রস্তাবিত বিলটিতে কমিশনের ক্ষমতা ও কার্যপরিধি যথেষ্ট সীমিত রাখা হয়েছে বলে তাদের দাবি।
তাদের আরও অভিযোগ, প্রস্তাবিত আইনটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্যারিস প্রিন্সিপালস এবং সংশ্লিষ্ট মানবাধিকার কনভেনশনের মানদণ্ডের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
দুই দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ
গত বৃহস্পতিবার ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়। পরে বিল দুটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়।
বিরোধী সদস্যদের আপত্তির অন্যতম কারণ হলো বিল দুটি পর্যালোচনার জন্য পর্যাপ্ত সময় না দেওয়া। তাদের দাবি, মাত্র দুই কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেওয়ায় আইন দুটির বিভিন্ন ধারা, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড এবং সংশ্লিষ্টদের মতামত যাচাই করার সুযোগ কার্যত সীমিত হয়ে গেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে কয়েকটি বাতিল এবং কিছু অধ্যাদেশকে নতুন করে বিল আকারে সংসদে আনার প্রক্রিয়া চলছে। এর মধ্যে গুম প্রতিরোধ ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত আইন দুটি নিয়ে শুরু থেকেই মানবাধিকারকর্মী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে।
বিরোধী সদস্যরা বলছেন, পর্যাপ্ত আলোচনা, বিশেষজ্ঞ মতামত এবং অংশীজনদের বক্তব্য বিবেচনায় না নিয়ে দ্রুত আইন প্রণয়ন করা হলে এর কার্যকারিতা নিয়ে ভবিষ্যতে প্রশ্ন উঠতে পারে। এ কারণে বিল দুটির সংসদীয় প্রক্রিয়ার কোনো পর্যায়েই তারা অংশ না নেওয়ার অবস্থান নিয়েছেন।
