দেশের চলমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, আগামী ১০ বছরে কীভাবে জ্বালানি সমস্যার সমাধান করা হবে, তার একটি বিস্তারিত পরিকল্পনা সংসদে উপস্থাপন করা হবে।
শনিবার (১৫ আগস্ট) ঢাকার মহাখালীর টিঅ্যান্ডটি মাঠে দেশনেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের মানুষ বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকটে ভোগান্তিতে পড়েছেন। সরকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে দ্রুত কাজ করছে। গ্যাস সরবরাহে সাম্প্রতিক সমস্যার অন্যতম কারণ হিসেবে একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে দুর্ঘটনার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
তারেক রহমান বলেন, দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে দীর্ঘদিন নতুন করে অনুসন্ধান ও খনন করা হয়নি। গ্যাসের নিজস্ব উৎস বাড়ানোর পাশাপাশি জ্বালানি খাতে দেশের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বাপেক্স) দ্রুত অনুসন্ধান ও খনন কার্যক্রম শুরু করবে।
তিনি জানান, বর্তমানে বিদেশ থেকে আমদানি করা এলএনজি সংরক্ষণ ও সরবরাহের জন্য দেশে দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। এর মধ্যে একটি টার্মিনালে দুর্ঘটনার কারণে সাময়িকভাবে গ্যাস সরবরাহে সমস্যা তৈরি হয়েছে। কারিগরি ত্রুটি ইতোমধ্যে সারানো হয়েছে এবং আগামী কয়েক দিনের মধ্যে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, তৃতীয় একটি এলএনজি টার্মিনালের উদ্যোগ আগের সরকারের সময়ে বাতিল করা হয়েছিল। এখন নতুন করে সেটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ ধরনের টার্মিনাল নির্মাণে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হয় এবং বিশ্বের অল্প কয়েকটি দেশেই এগুলো তৈরি করা হয়। দ্রুত ব্যবস্থা নিতে চীনের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলেও জানান তিনি। পাশাপাশি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গেও এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন।
চলমান বিদ্যুৎ সংকটের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে তারেক রহমান বলেন, মানুষের কষ্ট কমাতে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। একই সঙ্গে তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি সমালোচনার পাশাপাশি নিজস্ব পরিকল্পনা জনগণের সামনে তুলে ধরার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, কিছু রাজনৈতিক দল গ্যাস ও বিদ্যুতের দাবিতে প্রতিবাদ করছে। তাদের একটি প্রতিবাদ কর্মসূচিতে সামনে হারিকেন রেখে পেছনে ফ্যান চালানোর বিষয়টি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ড রাজনৈতিক হটকারিতা ছাড়া আর কিছু নয়।
তারেক রহমান বলেন, ‘গ্যাস দে, বিদ্যুৎ দে’ স্লোগান দিয়ে শুধু জনগণকে বিভ্রান্ত না করে সমস্যার সমাধানে কার্যকর পরিকল্পনা দিতে হবে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধানে সরকারের চেয়ে ভালো কোনো পরিকল্পনা কেউ দিতে পারলে তা বাস্তবায়নের বিষয়েও তিনি চ্যালেঞ্জ জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি জনগণের জন্য কাজ করছে এবং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে। আগামী সংসদে আগামী ১০ বছরের জ্বালানি পরিকল্পনা উপস্থাপন করা হবে। এর মাধ্যমে দেশের মানুষের জ্বালানি সমস্যার স্থায়ী সমাধানের পথ তৈরি করা হবে।
দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, বিগত সরকারের সময়ে দেশের অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কৃষিসহ বিভিন্ন খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মেগা প্রকল্পে অতিরিক্ত ব্যয় দেখিয়ে অর্থ পাচার, স্বাস্থ্য খাতে নির্ভরশীলতা তৈরি এবং মানুষের মতপ্রকাশের অধিকার সীমিত করার মতো অভিযোগও তিনি তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, এসব পরিস্থিতির বিরুদ্ধে জনগণ আন্দোলন করেছে এবং গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আগের সরকারের পতন ঘটেছে। পরবর্তী সময়ে জনগণ ভোটের মাধ্যমে তাদের পছন্দের সরকার নির্বাচিত করেছে।
নির্বাচনের আগে বিএনপির দেওয়া ৩১ দফার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ওই কর্মসূচিতে অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, শিল্প, কর্মসংস্থান এবং নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের বিষয়ে দলের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছিল। নির্বাচিত সরকার হিসেবে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, দেশের জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করতে হবে। ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি হাতকে কর্মীর হাতে রূপান্তর করার লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে। প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়িয়ে দেশের মানুষের সক্ষমতা কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
গণতন্ত্র ও জবাবদিহিতার গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতার পর দেশে গণতন্ত্র বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কার্যকর থাকলে সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয় এবং জনগণের কল্যাণে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
তিনি বলেন, আজ তিনি কী পেলেন সেটি বড় বিষয় নয়, বরং দেশ ও দেশের মানুষের জন্য কী দিতে পারলেন সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। শহীদ জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার দেখানো পথে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি খালেদা জিয়ার জন্মদিনে দেশ গঠনের জন্য সবাইকে নতুন করে শপথ নেওয়ার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে ঢাকা-১৭ আসনের বিভিন্ন এলাকার নেতৃবৃন্দ বক্তব্য দেন। এ সময় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন, প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন এবং ঢাকা-১৭ আসনের প্রতিনিধি ও প্রধানমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব-২ আব্দুর রহমান সানীসহ স্থানীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
