তামাক নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন ছাড়া এসডিজির লক্ষ্য অর্জন কঠিন

বছরে তামাকজনিত রোগে মারা যান প্রায় ২ লাখ

  • নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশই হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোক, ক্যানসারসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগে (এনসিডি) হয়ে থাকে। এসব রোগের অন্যতম প্রধান ঝুঁকি তামাক ও নিকোটিন পণ্যের ব্যবহার। তাই শক্তিশালী আইন প্রণয়ন ও তার কঠোর বাস্তবায়ন ছাড়া অসংক্রামক রোগজনিত অকালমৃত্যু এক-তৃতীয়াংশ কমিয়ে আনার টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন কঠিন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান) ও অ্যান্টি টোব্যাকো মিডিয়া অ্যালায়েন্স (আত্মা) আয়োজিত ‘তামাক নিয়ন্ত্রণ, এনসিডি ও এসডিজি: বাংলাদেশের অগ্রগতি ও করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন।

বছরে প্রায় দুই লাখ মানুষের মৃত্যু

গোলটেবিল বৈঠকে জানানো হয়, তামাক ব্যবহারজনিত বিভিন্ন রোগে বাংলাদেশে বছরে প্রায় দুই লাখ মানুষ মারা যান। এর ফলে এসডিজির স্বাস্থ্যবিষয়ক লক্ষ্য-৩ অর্জনে তামাক অন্যতম বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বক্তারা বলেন, তামাকের ক্ষতিকর প্রভাব শুধু স্বাস্থ্য খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দারিদ্র্য নির্মূল, খাদ্যনিরাপত্তা ও টেকসই কৃষি, মানসম্মত শিক্ষা, লিঙ্গসমতা, পরিবেশ সুরক্ষা, জলবায়ু মোকাবিলা এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণসহ এসডিজির প্রায় সব লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রেই তামাক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

ই-সিগারেট ও ভেপিং নিয়ে উদ্বেগ

বক্তারা বলেন, সরকার সম্প্রতি তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধন করেছে। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রে এটি একটি ইতিবাচক ও প্রশংসনীয় পদক্ষেপ। তবে ই-সিগারেট, ভেপিংসহ নতুন ধরনের তামাক ও নিকোটিন পণ্যকে আইনের আওতার বাইরে রাখা উদ্বেগের বিষয়।

তাদের মতে, তরুণদের মধ্যে এসব পণ্যের ব্যবহার বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। তাই জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ই-সিগারেট, ভেপিংসহ উদীয়মান নিকোটিন পণ্যের ক্ষেত্রেও দ্রুত কার্যকর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এসব পণ্য নিষিদ্ধ করেছে বলেও বৈঠকে উল্লেখ করা হয়।

দ্রুত বিধিমালা প্রণয়নের দাবি

বৈঠক থেকে সদ্য সংশোধিত তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের আওতায় দ্রুত প্রয়োজনীয় বিধিমালা প্রণয়নের দাবি জানানো হয়।

একই সঙ্গে তামাক কোম্পানির প্রভাব থেকে আইন ও নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়াকে সুরক্ষিত রাখার ওপর গুরুত্ব দেন বক্তারা। এ জন্য তামাক নিয়ন্ত্রণবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি এফসিটিসির ৫.৩ অনুচ্ছেদ কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়।

‘তামাক নিয়ন্ত্রণ শুধু স্বাস্থ্য খাতের বিষয় নয়’

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, তামাক নিয়ন্ত্রণকে শুধু স্বাস্থ্য খাতের বিষয় হিসেবে দেখলে হবে না। এটি দেশের উন্নয়ন, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

তিনি বলেন, তামাক নিয়ন্ত্রণে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করা গেলে এসডিজি অর্জনের পথ আরও সুগম হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

‘ক্যানসারের ভয়াবহ পরিণতি চোখের সামনে’

বাংলাদেশ ক্যানসার সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. গোলাম মহিউদ্দিন ফারুক বলেন, ক্যানসারে আক্রান্ত মানুষের কষ্টের মধ্য দিয়ে তামাকের ভয়াবহ পরিণতি প্রতিনিয়ত চোখের সামনে উঠে আসছে।

তিনি বলেন, তামাকের ছোবল থেকে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম আরও জোরদার করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে আইন বাস্তবায়নের পাশাপাশি তামাক ব্যবহারের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।

গণমাধ্যমের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ

চ্যানেল ২৪-এর নির্বাহী পরিচালক জহিরুল আলম বলেন, তামাকের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরির পাশাপাশি বিদ্যমান আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়নেও গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদক রিয়াজ আহমদ বলেন, এসডিজি অর্জন এবং অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধের সঙ্গে তামাক নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ করা প্রয়োজন। তামাকের কারণে স্বাস্থ্য ও অর্থনীতিতে যে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হচ্ছে, তা মানুষের সামনে তুলে ধরতে হবে।

তামাকবিরোধী সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ

গোলটেবিল বৈঠকে আত্মার কনভেনর মর্তুজা হায়দার লিটন, প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়েরসহ বিভিন্ন তামাকবিরোধী সংগঠনের প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন।

আত্মার কো-কনভেনর নাদিরা কিরণের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রজ্ঞার হেড অব প্রোগ্রামস হাসান শাহরিয়ার।

বক্তারা বলেন, এসডিজির নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনের সময়সীমা ২০৩০ সাল। এর মধ্যে অসংক্রামক রোগজনিত অকালমৃত্যু কমাতে হলে তামাক নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আইন প্রণয়ন, বাস্তবায়ন, জনসচেতনতা এবং নীতিনির্ধারণে তামাক কোম্পানির প্রভাব বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।