ভেনিসে বাঁধনের ওপর হামলা, সংসদে তীব্র প্রতিবাদ

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ দাবি

  • নিজস্ব প্রতিবেদক

ইতালির ভেনিসে জনপ্রিয় অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনের ওপর হামলা ও হেনস্তার ঘটনায় জাতীয় সংসদে তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ইতালির আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নিতে দেশটির সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগসহ বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কার্যকর হস্তক্ষেপ দাবি করা হয়েছে।

মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন শুরু হয়। অধিবেশনের শুরুতেই পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য জহরত আদিব চৌধুরী বাঁধনের ওপর হামলার বিষয়টি সংসদে তুলে ধরে প্রতিবাদ ও বিচার দাবি করেন।

সংসদে বাঁধনের ওপর হামলার ঘটনা তুলে ধরেন জহরত আদিব

পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে জহরত আদিব চৌধুরী বলেন, বিষয়টি হয়তো প্রচলিত অর্থে পয়েন্ট অব অর্ডারের মধ্যে পড়ে না। তবে এটি বাংলাদেশের মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এ কারণে সংসদের বিশেষ ক্ষমতাবলে বিষয়টি তুলে ধরার সুযোগ চান তিনি।

ঘটনার বিবরণ তুলে ধরে এই সংসদ সদস্য বলেন, বাঁধন পরিবারের সদস্য ও ছোট সন্তানকে নিয়ে ইতালির একটি পার্কে হাঁটছিলেন। এ সময় তাকে শারীরিকভাবে আক্রমণ ও মৌখিকভাবে হেনস্তা করা হয়।

তিনি বলেন, বাঁধনের দিকে কোল্ড ড্রিংকস ও পানি ছুড়ে মারা হয়। একই সঙ্গে তাকে অত্যন্ত খারাপ ভাষায় কথা বলা হয়। তার ভাষ্য, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় বাঁধন সরাসরি জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন এবং নিজেকে একজন জুলাইযোদ্ধা হিসেবে অবস্থান নিয়েছিলেন। এ কারণেই তাকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।

‘একজন নারীর ওপর এমন হামলা মেনে নেওয়া যায় না’

জহরত আদিব চৌধুরী বলেন, একজন নারী এবং দেশের পক্ষে অবস্থান নেওয়া একজন শিল্পীর ওপর এ ধরনের হামলা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। হামলাকারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে ধরনের ঔদ্ধত্য দেখিয়েছে, তাতে মনে হচ্ছে বাংলাদেশে না থাকলেও পৃথিবীর যেকোনো জায়গায় তারা আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গ করতে এবং একজন নারীর ওপর হামলা চালাতে পারে।

তিনি বলেন, ঘটনার ২৪ ঘণ্টা পার হওয়ার আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন তথ্যের মাধ্যমে হামলাকারীদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কী পদক্ষেপ নিচ্ছে এবং ইতালির সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে কী উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য চায় সংসদ

এ সময় সংসদে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কোনো মন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন না। পরে মন্ত্রীরা সংসদে এলে তাদের কাছে বিষয়টি জানতে চাওয়া হবে বলে জানান জহরত আদিব চৌধুরী।

তিনি বলেন, বাঁধনের ওপর হামলার ঘটনায় সরকারের পক্ষ থেকে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তা সংসদ এবং দেশের জনগণ জানতে চায়।

এরপর ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কাউকে এ সময় সংসদে দেখা যাচ্ছে না। তারা সংসদে এলে এ বিষয়ে তাদের বক্তব্য শোনা হবে।

হামলার ঘটনাকে অত্যন্ত অমার্জনীয় ও নিন্দনীয় অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করে ডেপুটি স্পিকার বলেন, এর মাধ্যমে অপরাধের নির্মমতার চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীদের কেউ সংসদে এলে এ বিষয়ে তাদের বক্তব্য শোনা হবে বলেও জানান তিনি।

ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিতে ইতালিতে বাঁধন

বাঁধন ইতালিতে গেছেন ৮৩তম ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিতে। রুবাইয়াত হোসেন পরিচালিত ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ সিনেমার প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে তার।

এরই মধ্যে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ইতালির একটি পার্কে গেলে হামলা ও হেনস্তার শিকার হন তিনি। পরে বাঁধন জানান, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখার কারণেই তার ওপর হামলা চালানো হয়েছে।

বাঁধনের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলাকারীদের কয়েকজন নিজেদের আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। উল্লেখ্য, ওই দুটি সংগঠনের কার্যক্রম বর্তমানে বাংলাদেশে নিষিদ্ধ।

বাঁধনের ওপর হামলার প্রতিবাদ আসিফ মাহমুদের

এদিকে বাঁধনের ওপর হামলার ঘটনায় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তিনি বাঁধনের প্রতি পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করেছেন।

মঙ্গলবার সকালে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে আসিফ মাহমুদ বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম সহযোদ্ধা ও অভিনেত্রী বাঁধনের ওপর নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের হামলা এবং তাকে শারীরিকভাবে আঘাত করার ঘটনায় তিনি তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছেন।

‘পরাজিত রাজনৈতিক শক্তির পুরোনো চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ’

আসিফ মাহমুদ বলেন, একটি গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জনগণ যে ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে প্রত্যাখ্যান করেছে, সেই নিষিদ্ধ ও সন্ত্রাসী সংগঠনের পলাতক নেতা-কর্মীরা এখনো হামলা ও সহিংসতা চালিয়ে যাচ্ছে। তার মতে, বাঁধনের ওপর হামলাও পরাজিত ও নিষিদ্ধ রাজনৈতিক শক্তির পুরোনো সন্ত্রাসী চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ।

জুলাইয়ের গণআন্দোলনে বাঁধনের সাহসী ভূমিকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের মানুষের অধিকার এবং স্বৈরাচারমুক্ত বাংলাদেশের দাবিতে বাঁধন রাজপথে ছিলেন এবং নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছিলেন।

আসিফ মাহমুদের ভাষ্য, বাঁধনের ওপর হামলা প্রমাণ করে, পরাজিত সন্ত্রাসী শক্তি এখনো প্রতিশোধ ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের রাজনীতি থেকে বের হতে পারেনি।

ইতালির আইনে বিচারের দাবি

হামলা, ভয় দেখানো কিংবা সহিংসতা চালিয়ে অরাজকতা সৃষ্টি করে জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষাকে দমিয়ে রাখা যাবে না বলে মন্তব্য করেন আসিফ মাহমুদ।

তিনি বলেন, ইতালির মাটিতে বাংলাদেশের একজন নাগরিকের ওপর হামলার সঙ্গে জড়িতদের দেশটির প্রচলিত আইনে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ দূতাবাসকে প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

বাঁধনের প্রতি পূর্ণ সংহতি জানিয়ে এনসিপির মুখপাত্র বলেন, জুলাইয়ের সহযোদ্ধাদের ওপর যেকোনো হামলার বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান স্পষ্ট।

‘বাঁধনকে নিয়ে আমরা গর্বিত’: সারজিস

অন্যদিকে বাঁধনের প্রতি সংহতি জানিয়েছেন এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম। সোমবার দিবাগত রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বাঁধনের পাশে থাকার কথা জানান।

বাঁধনকে উদ্দেশ করে সারজিস আলম বলেন, ‘আপনি এই দেশের জন্য লড়াই করেছেন, দেশের মানুষকে স্বৈরাচার থেকে মুক্ত করার জন্য লড়াই করেছেন।’

‘পুরো বাংলাদেশ আপনার সঙ্গে’

বাঁধনের ওপর হামলাকারীদের কঠোর সমালোচনা করে সারজিস আলম তাদের খুনিদের দালাল ও বিবেকবোধ বিক্রি করে দেওয়া নরপশু হিসেবে উল্লেখ করেন। তার ভাষ্য, এ ধরনের ব্যক্তিদের কাছ থেকে এর চেয়ে বেশি কিছু আশা করার সুযোগ নেই।

বাঁধনের উদ্দেশে সারজিস আলম আরও বলেন, ‘আমরা সবাই আপনার সাথে আছি। পুরো বাংলাদেশ আপনার সাথে।’

ভেনিসে একজন বাংলাদেশি শিল্পীর ওপর হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংসদে প্রতিবাদ, রাজনৈতিক নেতাদের নিন্দা এবং কূটনৈতিক উদ্যোগের দাবি উঠেছে। এখন ইতালির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ ঘটনায় কী পদক্ষেপ নেয়, সেদিকেই নজর থাকবে।