দেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য সরকার ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিএনপি নেতা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের দায়িত্ব পালন নিয়ে সমালোচনা করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।
তিনি বলেছেন, বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে দায়িত্বে রেখে দ্রুত দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করা সম্ভব নয়।
সোমবার দুপুরে ঢাকার বাংলামোটরে এনসিপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিভিন্ন সময়ে অসংলগ্ন বক্তব্য দিয়েছেন এবং দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন। সংস্কার ইস্যুতেও তিনি জাতির সঙ্গে প্রতারণামূলক কথা বলেছেন বলে অভিযোগ করেন এনসিপির আহ্বায়ক।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সংসদে প্রশ্ন করা হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জবাবদিহি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। নাহিদ বলেন, ‘পল্টনের বক্তব্য’, ‘রাজপথের বক্তব্য’সহ বিভিন্ন কথা বলে তিনি বিষয়গুলো এড়িয়ে গেছেন এবং এক ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করেছেন।
নাহিদ ইসলামের ভাষ্য, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যে স্বাভাবিক নেই, তা এখন জনগণের সামনে স্পষ্ট। এর জন্য বর্তমান সরকার, প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দায়ী বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘দ্রুত দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হলে এটা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে দায়িত্বে রেখে সম্ভব নয়।’
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সমালোচনা
দেশের বিভিন্ন স্থানে দখলবাজি, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলে নাহিদ ইসলাম বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরের পরিস্থিতির ধারাবাহিকতা এখনও দেখা যাচ্ছে।
সম্প্রতি মিরপুরের রাড্ডা সেন্টার এবং কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ভাঙচুরের ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব ঘটনায় প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার বিষয়টি সামনে এসেছে।
সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ভাঙচুরের ঘটনাকে একটি ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করে নাহিদ বলেন, সেখানে প্রশাসন তাৎক্ষণিকভাবে হামলা ঠেকাতে বা বন্ধ করতে পারেনি। পরে কারা হামলা করেছে কিংবা ভুক্তভোগীর কোনো দায় রয়েছে কি না, তা নিয়ে নানা আলোচনা তৈরি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তার দাবি, রাজধানীতে ঘটেছে বলেই এসব ঘটনা গণমাধ্যমে বেশি এসেছে। দেশের অন্যান্য এলাকাতেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে বলে তিনি দাবি করেন।
জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য নিয়ে সমালোচনা
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের প্রথম জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া ভাষণ নিয়েও সমালোচনা করেন নাহিদ ইসলাম।
তিনি বলেন, ওই ভাষণে জনগণের প্রত্যাশা ও আশা-আকাঙ্ক্ষা যথাযথভাবে উঠে আসেনি। সেখানে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনা ও দলের ইশতেহারের বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
নাহিদ ইসলামের দাবি, এসব প্রকল্প দেশের অভ্যন্তরে প্রত্যাশা অনুযায়ী সফল হয়নি। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে দারিদ্র্য দূরীকরণ ও কর্মসংস্থানের যে লক্ষ্য ছিল, তা পূরণ হয়নি বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের চলমান জ্বালানি সংকট এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব আরও গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরা প্রয়োজন ছিল বলে মনে করেন তিনি।
নাহিদ বলেন, পারস্য উপসাগর থেকে বাংলাদেশের জাহাজে জ্বালানি আনার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে হুঁশিয়ারি
স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়েও কথা বলেন এনসিপির আহ্বায়ক। তিনি অভিযোগ করেন, নির্বাচনটি বারবার পিছিয়ে দেওয়া হচ্ছে এবং নির্বাচন কমিশনকে দলীয়করণের মাধ্যমে নির্বাচনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা চলছে।
নাহিদ ইসলাম বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে ন্যূনতম আশঙ্কা তৈরি হলে যে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না কিংবা নির্বাচন ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ করার চেষ্টা করা হবে, তখন এনসিপি নীরব থাকবে না।
তিনি বলেন, জাতীয় নির্বাচনের মতো দেশের স্থিতিশীলতার কথা বিবেচনা করে এবার তারা বসে থাকবে না। নির্বাচন প্রভাবিত করার চেষ্টা হলে সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে তা প্রতিরোধ করা হবে।
সংবিধান সংস্কারে মৌলিক পরিবর্তনের দাবি
সংবিধান সংশোধনী কমিটি নিয়েও আপত্তি জানান নাহিদ ইসলাম। তার দাবি, সংশোধনের নামে রাষ্ট্র সংস্কারের আকাঙ্ক্ষাকে ধুলিসাৎ করার চেষ্টা চলছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা রাষ্ট্রের কসমেটিক সার্জারি চাই না। আমরা চাই মৌলিক সংস্কার।’
এর আগে ১৭ বার সংবিধান সংশোধন করা হলেও তাতে মৌলিক পরিবর্তন আসেনি দাবি করে নাহিদ বলেন, দ্রুত এই প্রক্রিয়া বন্ধ করে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সভা আহ্বান করতে হবে।
প্রাথমিকের শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে অভিযোগ
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়ায় অনেক চাকরিপ্রার্থী নিয়োগপত্র না পাওয়ার বিষয়েও কথা বলেন নাহিদ ইসলাম।
তিনি দাবি করেন, প্রায় আড়াই হাজার চাকরিপ্রার্থীকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তাদের বেশিরভাগের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা, সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা কিংবা রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের কোনো সুস্পষ্ট তথ্য-প্রমাণ নেই বলেও দাবি করেন তিনি।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে যুক্ত অনেক সহযোদ্ধাকেও নিয়োগ থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন নাহিদ।
তিনি বলেন, এনসিপি এসব চাকরিপ্রার্থীর পাশে থাকবে। কোনো চাকরিপ্রার্থীকে অন্যায়ভাবে নিয়োগ থেকে বাদ দেওয়া হলে তার পক্ষে আন্দোলন করার কথাও জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। এর আগে একই স্থানে রাজনৈতিক পর্ষদের জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সংবাদ সম্মেলনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘ সফর, স্থানীয় সরকার নির্বাচন, সংবিধান সংস্কার এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগসহ বিভিন্ন বিষয়ে দলের অবস্থান তুলে ধরে এনসিপি।
