কারাগার ও রিমান্ডে নির্যাতনের অভিযোগ এনসিপির সাবেক যুগ্ম সদস্য সচিবের

  • নিজস্ব প্রতিবেদক

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে আপত্তিকর পোস্ট দেওয়ার অভিযোগে করা মামলায় গ্রেপ্তারের পর কারাগার ও রিমান্ডে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) অব্যাহতি পাওয়া যুগ্ম সদস্য সচিব গাজী সালাউদ্দিন তানভীর। তার দাবি, কারাগারে তাকে অমানবিক পরিবেশে রাখা, অজ্ঞাত ইনজেকশন প্রয়োগ এবং বৈদ্যুতিক শক দেওয়ার মতো নির্যাতন করা হয়েছে।

শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) সকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন তানভীর। শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি নিজে পুরো বক্তব্য দিতে না পারায় পরে তার লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান এনসিপির কেন্দ্রীয় সদস্য ইয়াসির আরাফাত।

লিখিত বক্তব্যে তানভীর বলেন, গত ২ আগস্ট সাইবার সুরক্ষা আইনে তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। মামলার বাদী বগুড়া সদর থানা বিএনপির সভাপতি এইচ এস মাফুতুন আহমেদ খান। এরপর ৫ আগস্ট তাকে গ্রেপ্তার করে বগুড়া কারাগারে পাঠানো হয়।

কারাগারে নেওয়ার পর তাকে একটি অপরিচ্ছন্ন ও আলো-বাতাসহীন সেলে রাখা হয় বলে অভিযোগ করেন তানভীর। সেখানে বিদ্যুৎ ও ফ্যানের ব্যবস্থা ছিল না বলেও দাবি করেন তিনি। তার ভাষ্য, কারারক্ষীদের কয়েকজন তাকে ‘জুলাই জঙ্গি’ বলে গালিগালাজ করতেন এবং অন্য বন্দীদের কাছ থেকেও অপমানজনক আচরণের শিকার হতে হয়েছে।

তানভীর অভিযোগ করেন, ৫ আগস্ট কারাগারে যাওয়ার পর অন্যদের তুলনায় তাকে নিম্নমানের খাবার দেওয়া হতো। দীর্ঘদিন পচা ও বাসি খাবার খাওয়ানোর কারণে একপর্যায়ে তিনি ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হন। পরে তাকে শহীদ জিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধের পরিবর্তে অজ্ঞাত ওষুধ খাওয়ানো হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

অজ্ঞাত ইনজেকশন দেওয়ার অভিযোগ

তানভীরের দাবি, কারাগারে থাকা অবস্থায় তার শরীরে ৭০ থেকে ৮০টি ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে। এসব ইনজেকশন কীসের এবং কেন দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে তাকে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

তার ভাষ্য, একদিন হঠাৎ হাত-পা কাঁপতে শুরু করলে একজন চিকিৎসক তাকে ইনজেকশন দেন। এরপর তার ডান হাত ও ডান পা অবশ হয়ে যায়। পরে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক স্ট্রোক হয়েছে বলে জানান বলে দাবি করেন তানভীর। তবে কারা কর্তৃপক্ষ তা অস্বীকার করে বলে অভিযোগ তার।

তিনি আরও বলেন, হাসপাতালে তার সিটি স্ক্যান করা হলেও রিপোর্ট সম্পর্কে তাকে জানানো হয়নি। পরে এমআরআই করানোর সময় মেশিনের ভেতরে থাকা অবস্থায় বিকট শব্দ হয়ে সেটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর কোমর থেকে নিচের অংশ অবশ হয়ে যায় এবং তিনি ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা অচেতন ছিলেন বলে লিখিত বক্তব্যে দাবি করেন।

ঢাকায় আনার পরও নির্যাতনের অভিযোগ

উন্নত চিকিৎসার কথা বলে তাকে ঢাকায় আনা হলেও এখানেও ভালো চিকিৎসা পাননি বলে অভিযোগ করেন তানভীর। কেরানীগঞ্জের কারাগারের সেল নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি।

তানভীরের অভিযোগ, চিকিৎসা শেষে তাকে কারাগারে নেওয়ার সময় গাড়িতে সাদা পোশাকের কয়েকজন ব্যক্তি ওঠেন এবং সেখানে তাকে নির্যাতন করা হয়। এ সময় নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও সালাউদ্দিন আম্মারের নাম উল্লেখ করে তাকে ভয় দেখানো হয় বলেও দাবি করেন তিনি।

তার আরও অভিযোগ, কারাগারে থাকা আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতাকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া এবং রাতে গাড়িতে করে বাইরে নেওয়ার ঘটনা তিনি দেখেছেন। এসব বিষয় দেখার কারণেই তার ওপর নির্যাতন করা হয়ে থাকতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

তানভীর বলেন, নির্যাতনের পর তার শারীরিক অবস্থা এতটাই খারাপ হয়েছে যে বর্তমানে প্রস্রাব ও পায়খানার জন্য ব্যাগ ও প্যাড ব্যবহার করতে হচ্ছে। তিনি বর্তমানে একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এবং তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

শরীরে ইনজেকশন ও বৈদ্যুতিক শকের চিহ্ন পাওয়ার দাবি চিকিৎসকের

সংবাদ সম্মেলনে এনসিপি সমর্থিত চিকিৎসকদের সংগঠন ন্যাশনাল হেলথ অ্যালায়েন্সের সদস্য সচিব ডা. আব্দুল আহাদও বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, তানভীরের শরীর পরীক্ষা করে বিভিন্ন স্থানে অজ্ঞাত ইনজেকশনের চিহ্ন পাওয়া গেছে।

তার দাবি, শরীরের বিভিন্ন অংশে ৫০টির বেশি ইনজেকশনের মার্ক দেখা গেছে। তবে কী ধরনের ইনজেকশন, কে বা কারা দিয়েছেন এবং চিকিৎসাগতভাবে এর প্রয়োজন ছিল কি না, সে বিষয়ে কোনো সন্তোষজনক তথ্য পাওয়া যায়নি বলে জানান তিনি।

ডা. আব্দুল আহাদ আরও দাবি করেন, তানভীরের শরীরে বৈদ্যুতিক শক দেওয়ার চিহ্নও দেখা গেছে। এ ধরনের নির্যাতন করা হয়ে থাকলে এর কারণ ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় তদন্তের মাধ্যমে বের করার দাবি জানান তিনি।

চিকিৎসকের ভাষ্য অনুযায়ী, তানভীরের নিউরোলজিক্যাল পরীক্ষায় শরীরের বিভিন্ন অংশে অস্বাভাবিকতা পাওয়া গেছে। থোরাসিক ১২ নম্বর ভার্টিব্রার পর থেকে নিচের অংশে তার অনুভূতি নেই এবং তিনি পা নড়াতে পারছেন না। প্রস্রাবের নিয়ন্ত্রণও হারিয়েছেন তিনি। এ কারণে চিকিৎসকদের পরামর্শে তাকে ক্যাথেটার দেওয়া হয়েছে।

ডা. আব্দুল আহাদ বলেন, বর্তমানে তার শারীরিক দুর্বলতা কতটা ও কখন পুনরুদ্ধার হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। বৈদ্যুতিক শকের কারণে স্পাইন, নার্ভ রুট কিংবা পেরিফেরাল নার্ভ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকতে পারে বলেও জানান তিনি।

স্বাধীন তদন্তের দাবি

তানভীরের গ্রেপ্তার থেকে শুরু করে পুলিশ হেফাজত ও কারাগারে তার সঙ্গে কী ঘটেছে, তা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। একই সঙ্গে শরীরে পাওয়া ইনজেকশন ও বৈদ্যুতিক শকের চিহ্নের কারণ এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত, তা নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখার আহ্বান জানানো হয়েছে।

তানভীর তার বক্তব্যে বলেন, নির্যাতনের ঘটনায় তার জীবনের ঝুঁকি রয়েছে। এরপরও সত্য তুলে ধরার জন্য তিনি সংবাদ সম্মেলনে এসেছেন। একই ধরনের ঘটনা যেন আর কারও সঙ্গে না ঘটে, সে জন্য তিনি সংশ্লিষ্টদের কাছে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।