সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ২৫ সেন্টিমিটার বেড়ে গেলে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের প্রায় ৪ শতাংশ ভূমি পানিতে তলিয়ে যেতে পারে। এতে প্রায় এক কোটি মানুষের বসতবাড়ি ও জীবিকা গুরুতর ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের কনফারেন্স রুম-৪-এ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বক্তব্য দেওয়ার সময় এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের অংশ হিসেবে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।
বক্তব্যে তারেক রহমান বলেন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি শুধু উপকূলীয় অঞ্চল নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর জন্যও বহুমাত্রিক সংকট তৈরি করছে। বাংলাদেশের মতো বদ্বীপ রাষ্ট্রে এর প্রভাব আরও গভীর হতে পারে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে শত শত নদী প্রবাহিত হয়ে সাগরে গিয়ে মিশেছে। নদী ও পানির সঙ্গে এ দেশের মানুষের জীবন, অর্থনীতি ও সংস্কৃতি নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। তাই উপকূল সুরক্ষা এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকি মোকাবিলা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
প্রধানমন্ত্রী জানান, সীমিত সম্পদের মধ্যেও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশ বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে। এর মধ্যে আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা জোরদার, দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানো এবং উপকূলীয় এলাকায় সুরক্ষা অবকাঠামোতে বিনিয়োগের কথা তুলে ধরেন তিনি।
জলবায়ু সহনশীলতা বাড়াতে আগামী পাঁচ বছরে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খননের পরিকল্পনার কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে পানি সংরক্ষণ ও মজুদের জন্য পদ্মা ব্যারাজ উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়া, মাস্টার প্ল্যানের আওতায় তিস্তা ব্যারাজ আধুনিকায়ন এবং ২৫ কোটি গাছ লাগানোর লক্ষ্যের কথা উল্লেখ করেন তিনি।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জোর
বক্তব্যে বাংলাদেশের সবুজ প্রবৃদ্ধির পরিকল্পনাও তুলে ধরেন তারেক রহমান। তিনি জানান, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুতের অন্তত ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সৌরবিদ্যুতের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এর পাশাপাশি সবুজ শিল্পের বিকাশ, পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা সম্প্রসারণ, জাতীয় কার্বন বাজার গড়ে তোলা এবং বন, জলাভূমি ও ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় প্রতিবেশব্যবস্থা সুরক্ষায় বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধু অভিযোজনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করলেই সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ কমানোর পাশাপাশি জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা বাড়াতে হবে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে চার দাবি
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে চারটি জরুরি পদক্ষেপের আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
প্রথমত, বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ দ্রুত ও ব্যাপকভাবে কমিয়ে বৈশ্বিক উষ্ণতা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমার মধ্যে রাখার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
দ্বিতীয়ত, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর অভিযোজন কার্যক্রমের জন্য পূর্বানুমেয় ও সহজলভ্য অর্থায়ন নিশ্চিত করার দাবি জানান।
তৃতীয়ত, ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় দেশগুলোর কাছে জলবায়ু-সহনশীল প্রযুক্তি, প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত এবং আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থার সুযোগ বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
চতুর্থত, জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি, ক্ষয়ক্ষতি ও লোকসান মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদারের পাশাপাশি সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য মর্যাদাপূর্ণ পুনর্বাসন ও জীবনযাপনের সুযোগ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী।
তারেক রহমান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় বাংলাদেশের মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো একা এগিয়ে যেতে পারবে না। বৈশ্বিক সহযোগিতা ও সহায়তা বাড়ানো প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, সমুদ্রপৃষ্ঠ দ্রুত বাড়ছে। তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত রাখতে এখনই আরও দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে কোনো দেশ যেন একা সংকটের মুখে না পড়ে, সে জন্য আন্তর্জাতিক ঘোষণাপত্রে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলোকে বাস্তব পদক্ষেপে রূপ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বক্তব্য শেষ করেন প্রধানমন্ত্রী।
