বিশ্ব সংঘাত নিরসনে আলোচনা-কূটনীতির আহ্বান তারেক রহমানের

বিশ্বে চলমান সংঘাত ও অস্থিরতা নিরসনে আলোচনা, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া এবং পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, বিবদমান রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক স্বার্থরক্ষা এবং সম্মান-মর্যাদার ভিত্তিতেই দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সম্পর্ক গড়ে উঠতে হবে।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে বৃহস্পতিবার দেওয়া ভাষণে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। একই সঙ্গে তিনি রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান, ফিলিস্তিনিদের অধিকার, জলবায়ু ন্যায়বিচার, নিরাপদ অভিবাসন, নিরস্ত্রীকরণ, প্রযুক্তির ন্যায্য প্রবেশাধিকার এবং বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে দেশের অবস্থান তুলে ধরেন।

ভাষণের শুরুতে সাধারণ পরিষদের নতুন সভাপতিকে অভিনন্দন জানিয়ে দায়িত্ব পালনে বাংলাদেশের সহযোগিতার আশ্বাস দেন তারেক রহমান। বিদায়ী সভাপতিকেও দায়িত্ব পালনের জন্য ধন্যবাদ জানান তিনি।

মুক্তিযুদ্ধ ও ২০২৪ সালের আন্দোলনে নিহতদের স্মরণ

প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সব শহীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। স্বাধীনতার পর গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে যারা আত্মত্যাগ করেছেন, তাদেরও স্মরণ করেন।

এ সময় ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে নিহত ও আহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি বলেন, দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ বর্তমানে ‘ফ্যাসিবাদমুক্ত’ হয়েছে।

তিনি বলেন, চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে জনগণ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপিকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। জনগণই রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

জাতিসংঘে পরিবারের স্মৃতি

জাতিসংঘের বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে নিজের পরিবারের সঙ্গে এই প্রতিষ্ঠানের সম্পর্কের কথাও স্মরণ করেন তারেক রহমান।

তিনি বলেন, তাঁর বাবা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা খালেদা জিয়া একই বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশ ও জনগণের পক্ষে বক্তব্য দিয়েছেন। সেই ধারাবাহিকতায় তিনিও বাংলাদেশের স্বার্থ এবং শান্তিময় বিশ্ব প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা নিয়ে জাতিসংঘে বক্তব্য দিচ্ছেন।

এর আগে জিয়াউর রহমান ১৯৮০ সালে এবং খালেদা জিয়া ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিয়েছিলেন। তারেক রহমানের ভাষণের মধ্য দিয়ে পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে তাঁর জাতিসংঘে বক্তব্য দেওয়ার ঘটনা ঘটে।

সংঘাত বন্ধে আলোচনা ও কূটনীতির ওপর জোর

বিশ্বায়নের সময়ে বিশ্বের এক প্রান্তের ঘটনা অন্য দেশগুলোর ওপরও প্রভাব ফেলে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানবসৃষ্ট সংঘাতের কারণে বিভিন্ন দেশে অশান্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে এবং মানবিক সংকট তৈরি হচ্ছে।

যুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিও চাপের মুখে পড়ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। জ্বালানি নিরাপত্তা সংকট, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন এবং মূল্যস্ফীতির কারণে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে বলেও জানান।

তারেক রহমান বলেন, যেকোনো সংঘাতের সমাধান আলোচনা, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে হওয়া উচিত। যুক্তি, কূটনীতি, শিক্ষা ও মানবতাকে পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের আহ্বান জানান তিনি।

বাংলাদেশ জাতিসংঘকে পারস্পরিক স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল একটি সমঝোতামূলক বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কেন্দ্র হিসেবে দেখতে চায় বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।

নিরস্ত্রীকরণ ও ফিলিস্তিন প্রসঙ্গ

উন্নয়ন খাতের অর্থ সামরিক খাতে সরিয়ে নেওয়ার প্রবণতাকে বিশ্বশান্তির জন্য অন্তরায় হিসেবে উল্লেখ করেন তারেক রহমান।

তিনি বলেন, শান্তিপ্রিয় দেশ হিসেবে বাংলাদেশ পূর্ণাঙ্গ ও সাধারণ নিরস্ত্রীকরণ, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতাকামী ফিলিস্তিনি জনগণের দুর্দশা নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অধিকারসহ তাদের ন্যায্য দাবির প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন অব্যাহত থাকবে।

বহুপাক্ষিকতার প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকার

এবারের সাধারণ পরিষদের প্রতিপাদ্য ‘Restoring Trust, Managing Transformation: A United Nations that Delivers for All’ বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে প্রাসঙ্গিক বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে বাংলাদেশ বহুপাক্ষিকতার নীতিতে অটল রয়েছে বলে জানান তিনি। পিসবিল্ডিং কমিশনের ভাইস-চেয়ার হিসেবে বাংলাদেশ টেকসই শান্তি, সংঘাত প্রতিরোধ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শান্তি প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে বলেও উল্লেখ করেন।

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন তিনি। বিশেষ করে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশি নারীদের অংশগ্রহণকে ‘নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা’ কর্মসূচির প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকারের প্রতিফলন হিসেবে উল্লেখ করেন।

নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল অভিবাসনের আহ্বান

অভিবাসনকে মানবসভ্যতার মতোই প্রাচীন প্রক্রিয়া হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অভিবাসীরা তাদের জন্মভূমি ও বসবাসের দেশ উভয়ের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন।

বাংলাদেশ সরকার নিয়মিত, নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল অভিবাসন নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ জানিয়ে তিনি অভিবাসীদের অধিকার, মর্যাদা ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে আরও জোরালো বৈশ্বিক সহযোগিতার আহ্বান জানান।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনই একমাত্র সমাধান

রোহিঙ্গা সংকটকে বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি চাপ হিসেবে তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, নয় বছরেরও বেশি সময় ধরে মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশ আশ্রয় দিয়ে আসছে।

এর ফলে বাংলাদেশের সম্পদ, পরিবেশ, নিরাপত্তা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়েছে বলে জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের উৎস ও উৎপত্তি মিয়ানমারে। তাই এর সমাধানও সেখানেই নিহিত। বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদে তাদের মাতৃভূমি মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেওয়াকেই তিনি সংকটের একমাত্র সমাধান হিসেবে উল্লেখ করেন।

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃঢ় ও কার্যকর সমর্থন কামনা করেন তিনি। প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের জীবন রক্ষাকারী মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার আহ্বানও জানান।

জলবায়ু ন্যায়বিচার ও অর্থায়নের দাবি

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান তুলনামূলকভাবে কম হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশকে বহন করতে হচ্ছে।

ক্লাইমেট জাস্টিস, জলবায়ু অর্থায়ন এবং অভিযোজন সহায়তার ক্ষেত্রে COP-31-এ আরও জোরালো বৈশ্বিক পদক্ষেপ প্রত্যাশা করেন তিনি।

বাংলাদেশের পরিবেশ সুরক্ষায় সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। আগামী পাঁচ বছরে সারাদেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর কর্মসূচি, ক্লিন এনার্জি ও সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং বন্যা-খরা মোকাবিলায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের কর্মসূচির কথা জানান তিনি।

সুন্দরবনে মিঠাপানির প্রবাহ বৃদ্ধি ও পানি সংরক্ষণের লক্ষ্যে তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করেন। আন্তঃসীমান্ত পানি ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতার অংশ হিসেবে ১৯৯২ সালের ওয়াটার কনভেনশন স্বাক্ষরের কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী।

3-R কৌশলে বাংলাদেশ পুনর্গঠনের কথা

বাংলাদেশে দীর্ঘ সময়ের শাসন-শোষণের অবসান ঘটিয়ে গণতন্ত্রের পথে নতুন যাত্রা শুরু হয়েছে বলে ভাষণে উল্লেখ করেন তারেক রহমান।

তিনি বলেন, গুম, খুন, অপহরণ, দুর্নীতি, লুটপাট ও অর্থপাচারের মতো সমস্যার অবসান ঘটিয়ে দেশ পুনর্গঠনে সরকার ‘Recovery, Restoration and Reconstruction’ বা 3-R কৌশল অনুসরণ করছে।

দেশের সামনে সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনমিতিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করতে সরকার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।

বাংলাদেশকে ‘ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’ হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন তিনি। তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক ও উদ্ভাবকদের জন্য স্টার্টআপ উদ্যোগে চলতি অর্থবছরে ৫০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ রাখার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী।

নারী ক্ষমতায়ন ও সামাজিক সুরক্ষা

দেশের আর্থসামাজিক রূপান্তরে নারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নারী শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরিতে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে।

বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণের কথা জানান তিনি। স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত নারীদের বিনাবেতনে শিক্ষার সুযোগ দেওয়ার উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন।

শুধু রাজনৈতিক গণতন্ত্র নয়, অর্থনৈতিক গণতন্ত্রও নিশ্চিত করার লক্ষ্য রয়েছে বলে জানান তারেক রহমান। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল প্রতিটি পরিবার ও নাগরিকের কাছে পৌঁছে দিতে ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার্স কার্ড, স্পোর্টস কার্ড ও ই-হেলথ কার্ডের মতো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির কথা বলেন তিনি।

নারীপ্রধান পরিবারের নামে দেওয়া ‘ফ্যামিলি কার্ড’কে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। বিভিন্ন খাতের কার্ড সমন্বয় করে ভবিষ্যতে একটি ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান।

৩১ দফা বাস্তবায়নের কথা

চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের আগে জনগণের কাছে দেওয়া ৩১ দফা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলে ভাষণে জানান প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ‘Leave No One Behind’ নীতির সঙ্গে সরকারের ৩১ দফা কর্মসূচির বড় অংশের সামঞ্জস্য রয়েছে। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে শহর ও গ্রামের উন্নয়ন বৈষম্য কমানো এবং ২০৩০ এজেন্ডার আওতায় জবাবদিহিতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।

শিক্ষা ও খেলাধুলায় গুরুত্ব

শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও খেলাধুলাকে সরকারের অগ্রাধিকার খাত হিসেবে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের ইতিহাসে এবার শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

আগামী পাঁচ বছরে পর্যায়ক্রমে শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ ব্যয় করার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। কর্মমুখী ও নৈতিক মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করতে কারিগরি ও ব্যবহারিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথাও বলেন।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুলব্যাগ, পোশাক ও বিনামূল্যে দুপুরের খাবারের কর্মসূচির কথা উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে শিক্ষা সিলেবাসে স্পোর্টসকে বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার কথা জানান।

গত জুনে স্কুল শিক্ষার্থীদের নিয়ে দেশব্যাপী মাসব্যাপী ফুটবল টুর্নামেন্টে ২০ লাখের বেশি শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণের তথ্যও তুলে ধরেন তিনি।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তির ন্যায্য ব্যবহারের আহ্বান

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে ভবিষ্যৎ বিশ্বের চালিকাশক্তি হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্ব এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বায়োটেকনোলজি ও বিজ্ঞানের নতুন যুগে প্রবেশ করছে।

প্রযুক্তির অগ্রগতির সুফল যেন সব দেশের মানুষের কাছে সমানভাবে পৌঁছে, সে বিষয়ে গুরুত্ব দেন তিনি। বাংলাদেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী ও ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল সক্ষমতাকে নতুন সম্ভাবনা হিসেবে উল্লেখ করে উন্নত প্রযুক্তি, জ্ঞান ও গবেষণার সুযোগ সবার নাগালের মধ্যে আনার আহ্বান জানান।

তারেক রহমান বলেন, বর্তমানের ডিজিটাল বিভাজন যেন ভবিষ্যতের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিভাজনে পরিণত না হয়। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে সাশ্রয়ী প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

এআই ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দ্রুত বিকাশের সুফল যাতে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগানো যায়, সে জন্য জাতিসংঘের একটি কার্যকর নীতিমালা গ্রহণের আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।

এলডিসি উত্তরণে আন্তর্জাতিক সহায়তা চায় বাংলাদেশ

বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের অপেক্ষায় রয়েছে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, এই উত্তরণ প্রক্রিয়াকে টেকসই করতে নিশ্চিত অর্থায়ন, বাজারে প্রবেশাধিকার, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ধারাবাহিক আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন।

আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ, কার্যকর যোগাযোগব্যবস্থা ও অর্থবহ সহযোগিতার মাধ্যমে দেশগুলো পারস্পরিক সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

কোভিড-১৯ মহামারির অভিজ্ঞতা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বকে টিকে থাকতে হলে পারস্পরিক সহায়তা, সহমর্মিতা ও সহযোগিতা জরুরি। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে টিকা, চিকিৎসাসামগ্রী ও রোগ নির্ণয়ের সরঞ্জামের টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

জনগণের ক্ষমতায়নের ওপর গুরুত্ব

রাষ্ট্রের নাগরিকদের ক্ষমতাহীন রেখে কোনো রাষ্ট্র শক্তিশালী হতে পারে না বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার মাধ্যমে এমন একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর, কল্যাণমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায় বাংলাদেশ, যেখানে দল-মত, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে সবাই সমান অধিকার, সম্মান ও মর্যাদা নিয়ে নিরাপদে বসবাস করতে পারবেন।

বিনিয়োগবান্ধব বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়

গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুশাসন, জবাবদিহিতা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বিনিয়োগ পরিবেশে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তারেক রহমান।

ব্যবসা ও বিনিয়োগের জন্য নিরাপদ ও স্থিতিশীল পরিবেশ গড়ে তুলতে সরকার কাজ করছে জানিয়ে তিনি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ ও অংশীদারত্বকে স্বাগত জানান।

ভাষণের শেষাংশে প্রধানমন্ত্রী এমন একটি বাংলাদেশের প্রত্যাশা তুলে ধরেন, যেখানে তরুণরা নির্ভয়ে নিজেদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ পাবে, নারীরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জীবন পরিচালনা করতে পারবে এবং প্রতিটি শিশু তার সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ পাবে।

তিনি বলেন, নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ জীবনের নিশ্চয়তা দেওয়ার লক্ষ্যেই সরকারের অঙ্গীকার—‘সবার আগে বাংলাদেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ’।

বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের নীতি ও মূল্যবোধের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে বক্তব্য শেষ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।