জামিনের পরও মুক্তি নয়, নতুন মামলায় গ্রেফতার: আইনের ফাঁকে কতটা আটক রাখা যায়

আদালত থেকে জামিন পাওয়ার পরও কারাগার থেকে মুক্তি না পাওয়ার ঘটনা বাংলাদেশে নতুন নয়। একটি মামলায় জামিনের পর কারাগারের গেটেই অন্য মামলায় গ্রেফতার দেখানোর অভিযোগও রয়েছে। এতে একজন আসামি আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যেই দীর্ঘ সময় কারাগারে আটকে থাকছেন। সম্প্রতি এমনই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন ঢাকা থেকে গ্রেফতার হওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী, যার ছদ্মনাম আহসান আহমেদ।

২০২৫ সালের মার্চে ঢাকায় গ্রেফতার হন আহসান আহমেদ। তার বিরুদ্ধে দুটি মামলা ছিল। গ্রেফতারের পর পরিবার আইনজীবী নিয়োগ করে প্রথমে নিম্ন আদালত এবং পরে উচ্চ আদালতে জামিনের চেষ্টা করে।

নিম্ন আদালতে জামিন না পাওয়ার পর উচ্চ আদালত থেকে দুটি মামলাতেই জামিন পান তিনি। পুরো প্রক্রিয়ায় সময় লাগে প্রায় ছয় মাস।

কিন্তু আদালত থেকে জামিন পাওয়ার পরও কারাগার থেকে বের হতে পারেননি আহসান।

তার ভাষ্য, জামিনের খবর পাওয়ার পর তিনি কারাগার থেকে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। পরিবারের সদস্যরাও তাকে নিতে কারাগারের ফটকে উপস্থিত হয়েছিলেন। কিন্তু মুক্তির দিন সকালে কারাগারের একজন রাইটার তার হাতে নতুন একটি মামলার কপি তুলে দেন।

আহসান বলেন, তিনি জানতে পারেন অন্য একটি থানায় তার বিরুদ্ধে নতুন মামলা হয়েছে। তার দাবি, ওই মামলার বিষয়ে তিনি আগে কিছুই জানতেন না।

এরপর শুরু হয় নতুন করে আইনি লড়াই।

নতুন মামলায় গ্রেফতার দেখানোর পর সেটিতেও জামিনের জন্য আদালতের দ্বারস্থ হন তিনি। উচ্চ আদালত থেকে জামিন পাওয়ার পরও প্রতিবারই নতুন কোনো মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে বলে তার অভিযোগ।

এভাবে একবার নয়, কয়েক দফা জামিনের পরও মুক্তি আটকে যায় আহসানের।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, শেষ পর্যন্ত পঞ্চমবারের চেষ্টায় তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান। ততদিনে কারাগারে কেটে গেছে প্রায় দেড় বছর।

আহসান বলেন, প্রথমবার উচ্চ আদালত থেকে জামিন পাওয়ার সময়ই তার মুক্তি পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নতুন নতুন মামলায় গ্রেফতার দেখানোর কারণে তাকে আরও দীর্ঘ সময় কারাগারে থাকতে হয়েছে।

“আমার প্রথম যে জামিনটা হয়েছিল, সেই ছয় মাস সময়েই তো আমার কারাগার থেকে বের হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেখানে দেড় বছর লাগল আমার জেল থেকে বের হতে। শুধুমাত্র এই জামিনের পর নতুন করে গ্রেফতার দেখানোর কারণে।”

জামিনের পর নতুন মামলা, প্রশ্ন আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে

আহসানের অভিজ্ঞতা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা কি না, সেটি নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও জামিন পাওয়ার পরও কারাগার থেকে মুক্তি না পাওয়ার অভিযোগ বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে।

কোনো আসামি একটি মামলায় জামিন পাওয়ার পর তার বিরুদ্ধে অন্য কোনো মামলায় আইনগতভাবে গ্রেফতার দেখানো হলে ওই মামলার প্রক্রিয়াও তাকে অনুসরণ করতে হয়। ফলে একটি মামলায় জামিন পেলেও অন্য মামলায় আটক থাকার কারণে মুক্তি বিলম্বিত হতে পারে।

তবে কোনো ব্যক্তিকে এক মামলায় জামিন দেওয়ার পর ধারাবাহিকভাবে নতুন মামলায় গ্রেফতার দেখানোর ঘটনায় প্রশ্ন উঠছে, এর মাধ্যমে আইনি প্রক্রিয়ার সুযোগ ব্যবহার করে কাউকে দীর্ঘ সময় কারাগারে আটকে রাখা হচ্ছে কি না।

আইনের সীমা কোথায়?

আইনজীবীদের মতে, একজন আসামির বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকলে একটি মামলায় জামিন পেলেই সব ক্ষেত্রে তার মুক্তি নিশ্চিত হয় না। অন্য কোনো মামলায় বৈধভাবে গ্রেফতার বা আটক থাকার কারণ থাকলে সেই মামলার আইনি প্রক্রিয়াও সম্পন্ন করতে হয়।

তবে একই ব্যক্তিকে বারবার নতুন মামলায় গ্রেফতার দেখানোর ক্ষেত্রে মামলাগুলোর সময়, অভিযোগের ধরন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে আদালতের পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

মানবাধিকারকর্মীদের পক্ষ থেকেও দীর্ঘদিন ধরে বলা হচ্ছে, কোনো ব্যক্তিকে আইনি প্রক্রিয়ার নামে অযথা দীর্ঘ সময় আটক রাখা হলে তার মৌলিক অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

আহসান আহমেদের ঘটনা সেই প্রশ্নটিকেই সামনে এনেছে। একটি মামলায় আদালত যখন জামিন দিচ্ছেন, তখন একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে পরপর নতুন মামলা আসার প্রক্রিয়াটি কতটা স্বচ্ছ, এবং এসব মামলার মাধ্যমে একজন আসামিকে দীর্ঘ সময় কারাগারে আটকে রাখার সুযোগ কতটা রয়েছে, এখন সেটিই বড় প্রশ্ন।

কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তার বিচার আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই হওয়ার কথা। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া যেন শাস্তির বিকল্প হয়ে না দাঁড়ায়, সেটি নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের।