- নিজস্ব প্রতিবেদক
ট্রলারে করে নদীর গভীরে নিয়ে হাত বাঁধা ব্যক্তিদের হত্যা, মরদেহের পেট কেটে সিমেন্টভর্তি বস্তা বেঁধে পানিতে ফেলে দেওয়া এবং পরে এসব হত্যাকাণ্ডকে ‘গলফ অপারেশন’ নামে অভিহিত করার অভিযোগ উঠেছে সাবেক র্যাব কর্মকর্তা লে. কর্নেল জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ দেওয়া জবানবন্দিতে এসব অভিযোগ করেন র্যাবের সাবেক কর্মকর্তা মেজর (অব.) মো. সাব্বির রহমান ওসমানী।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ১৩তম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন সাব্বির রহমান। তিনি বর্তমানে বাংলাদেশ আর্মি ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, খুলনায় ডেপুটি এক্সাম কন্ট্রোলার হিসেবে কর্মরত।
চরদুয়ানীর ট্রলারে হত্যার বর্ণনা
জবানবন্দিতে সাব্বির রহমান জানান, ১৯৯৩ সালের ১৮ জুন ২৮তম বিএমএ লংকোর্সের মাধ্যমে সাঁজোয়া কোরে কমিশন লাভ করেন তিনি। ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বরে মেজর পদে র্যাবে বদলি হয়ে একই বছরের অক্টোবরে র্যাব-৮-এর বরিশাল ব্যাটালিয়নে উপ-অধিনায়ক হিসেবে যোগ দেন।
সে সময় র্যাবের মহাপরিচালক ছিলেন হাসান মাহমুদ খন্দকার, অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশনস) ছিলেন কর্নেল এস এম মতিউর রহমান এবং গোয়েন্দা শাখার পরিচালক ছিলেন লে. কর্নেল জিয়াউল আহসান।
সাক্ষীর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালের জানুয়ারির দিকে এক রাতে জিয়াউল আহসান সরকারি গাড়ি ও একটি মাইক্রোবাস নিয়ে র্যাব-৮-এর ব্যাটালিয়ন সদরদপ্তরে আসেন। পরে তাঁকে ও ব্যাটালিয়ন অধিনায়ককে সঙ্গে নিয়ে বের হওয়ার কথা জানান। কোনো অপারেশন দল প্রস্তুত করতে হবে কি না জানতে চাইলে তিনি প্রয়োজন নেই বলে জানান।
জিয়াউলের গাড়ির পেছনে ঢাকার গোয়েন্দা শাখা থেকে আসা একটি মাইক্রোবাসও চলতে থাকে। প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর তাঁরা বরগুনার পাথরঘাটার চরদুয়ানী ঘাটে পৌঁছান। সেখানে আগে থেকেই একটি ট্রলার প্রস্তুত ছিল।
সাব্বির রহমান বলেন, ঢাকার গোয়েন্দা শাখার সদস্যরা ট্রলারে ওঠার সময় হাত বাঁধা ও মাথায় কালো টুপি পরা এক ব্যক্তিকেও ট্রলারে তোলা হয়। তাঁকে ট্রলারের মাছ সংরক্ষণের খোলের মধ্যে রাখা হয়।
পরে জিয়াউল আহসান, ব্যাটালিয়ন অধিনায়ক ও সাব্বির রহমান ট্রলারের সুকানির কাছে বসেন। জিয়াউলের নির্দেশে ট্রলারটি চরদুয়ানী খাল পেরিয়ে মোহনার দিকে যায়। প্রায় তিন ঘণ্টা পর জিয়াউল ট্রলারের গতি কমিয়ে পানির গভীরতা মাপতে বলেন সাব্বিরকে।
সাক্ষীর বর্ণনা অনুযায়ী, পানির গভীরতা ও জোয়ার-ভাটার হিসাব নেওয়ার পর জিয়াউল গোয়েন্দা শাখার সদস্যদের খোলের ভেতর থেকে হাত বাঁধা ব্যক্তিকে বের করে আনতে বলেন।
চার সদস্য ওই ব্যক্তিকে ঘিরে ফেলেন। তাঁদের একজন ওই ব্যক্তির গলা ও পায়ের কাছে সিমেন্টভর্তি দুটি বস্তা বাঁধেন। এরপর মাথা ও কানের পাশে বালিশ চেপে ধরে পিস্তল দিয়ে গুলি করা হয়। পরে আরেক সদস্য গুলিবিদ্ধ ব্যক্তির পেট কেটে দেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন সাব্বির।
সবকিছু ঠিক আছে বলে সংকেত দেওয়ার পর জিয়াউল আবার ট্রলারের গতি কমাতে বলেন এবং পানির গভীরতা মাপার নির্দেশ দেন। গভীরতা জানার পর তাঁর নির্দেশেই গুলিবিদ্ধ মরদেহটি সিমেন্টভর্তি বস্তাসহ পানিতে ফেলে দেওয়া হয় বলে দাবি করেন সাক্ষী।
‘এভাবেই গলফ করতে হবে’
চরদুয়ানী থেকে বরিশালে ফেরার পথে পরিবেশ অস্বাভাবিক নীরব ছিল বলে জানান সাব্বির রহমান। তাঁর ভাষ্য, তখন জিয়াউল আহসান বলেন, ওই ব্যক্তিরা রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর এবং ‘এভাবেই গলফ করতে হবে’।
সাব্বির বলেন, এ ধরনের অভিযানকে তখন তিনি প্রথম ‘গলফ অভিযান’ হিসেবে জানতে পারেন।
সাক্ষীর দাবি, পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে জিয়াউল আরও বলেন, বিষয়টি নিয়ে মন খারাপ বা দুশ্চিন্তার কারণ নেই এবং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় এ বিষয়ে অবহিত।
বরিশালে ফিরে ব্যাটালিয়ন অধিনায়কের কাছে ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জিয়াউলের মুখ থেকেই সবকিছু শোনার কথা জানান। তাঁর সেখানে করার কিছু ছিল না বলেও উল্লেখ করেন। তবে বিষয়টি র্যাব সদরদপ্তরে জানানোর কথা বলেন।
বলেশ্বরে ভেসে ওঠে পেট কাটা মরদেহ
সাব্বির রহমান জানান, ২০১০ সালের মে মাসের দিকে একই ধরনের আরেকটি ঘটনা ঘটে। এর দুই-তিন দিনের মধ্যে শরণখোলা রেঞ্জের বলেশ্বর নদীতে মুখ ঢাকা, পেট কাটা এবং শরীরে সিমেন্টের বস্তা বাঁধা একটি মরদেহ ভেসে ওঠার খবর পান তাঁরা।
তাঁর ও ব্যাটালিয়ন অধিনায়কের সন্দেহ হয়, মরদেহটি আগের ‘গলফ অপারেশনের’ কোনো ভুক্তভোগীর হতে পারে।
বিষয়টি জিয়াউল আহসানকে জানানো হলে তিনি বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের নির্দেশ দেন। পরে অপারেশন রিপোর্টে বিষয়টি উল্লেখ করা প্রয়োজন কি না জানতে চাইলে জিয়াউল বলেন, তিনি বিষয়টি জেনেছেন, প্রয়োজন নেই। তবে ফলোআপ চালিয়ে যেতে বলেন।
সাক্ষীর ভাষ্য অনুযায়ী, পরে গোয়েন্দা তথ্যের মাধ্যমে জানা যায়, ডিএনএ পরীক্ষায় মরদেহটি সাবেক বিজিবি সদস্য নজরুলের বলে শনাক্ত হয়।
আলকাস মাঝিকে ‘এলিমিনেট’ করার নির্দেশের অভিযোগ
জবানবন্দিতে আলকাস মাঝি নামে এক ট্রলারচালকের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাও তুলে ধরেন সাব্বির রহমান।
তিনি বলেন, ২০১১ সালের জুনের দিকে জিয়াউল আহসান ফোন করে আলকাস মাঝির বিষয়ে জানতে চান। জিয়াউলের অভিযোগ ছিল, আলকাস ‘গলফ অপারেশন’ সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য চরদুয়ানী বাজারে বলে বেড়াচ্ছেন এবং এতে র্যাবের নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
সাক্ষীর ভাষ্য, এরপর জিয়াউল তাঁকে আলকাসকে ‘এলিমিনেট’ করার নির্দেশ দেন। শারীরিক অসুস্থতার কথা বলে সাব্বির ওই দায়িত্ব পালন করতে অস্বীকৃতি জানান। একপর্যায়ে জিয়াউল বলেন, ‘থাক, লাগবে না।’
এর প্রায় এক সপ্তাহ পর আলকাসের পরিবারের সদস্যরা র্যাব-৮ কার্যালয়ে এসে জানান, কয়েক দিন আগে জিয়াউলের কথা বলে ফোন করে আলকাসকে বাড়ি থেকে ডেকে নেওয়া হয়েছিল। এরপর থেকে তাঁর সঙ্গে আর যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।
সাব্বির রহমান বলেন, বিষয়টি শুনে তাঁর ও ব্যাটালিয়ন অধিনায়কের কাছে আলকাসের পরিণতি নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়। পরে পরিবারকে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি আর্থিক সহায়তা করা হয়।
সুন্দরবনে ‘সাজানো অভিযান’ চালানোর অভিযোগ
সাক্ষীর জবানবন্দিতে সুন্দরবনের কয়েকটি অভিযানের কথাও উঠে আসে। সাব্বির রহমানের দাবি, জিয়াউল আহসানের পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় তিনি ২০১১ ও ২০১২ সালে সুন্দরবনকেন্দ্রিক তিনটি অভিযানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
২০১১ সালের নভেম্বরে পশ্চিম সুন্দরবনের নিশানখালী এলাকায় একটি অভিযানের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, এটি র্যাব, কোস্টগার্ড ও বন বিভাগের যৌথ অভিযান হিসেবে পরিচালিত হয়। মূল অভিযানের আগে গোয়েন্দা শাখার একটি দল ঘটনাস্থলে চলে যায়।
সাক্ষীর দাবি, অভিযান শুরুর সময় বনের ভেতর থেকে হুইসেলের শব্দ শোনা যায়। তিনি এটিকে অগ্রগামী গোয়েন্দা সদস্যদের সংকেত হিসেবে বর্ণনা করেন। এরপর জিয়াউলের নির্দেশে বনের দিকে গুলি চালানো হয়।
পরে তল্লাশি চালিয়ে অস্ত্র ও গোলাবারুদের পাশাপাশি দুটি মরদেহ উদ্ধারের কথা জানানো হলেও মামলার প্রক্রিয়ায় ছয়টি মরদেহ দেখানো হয় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন তিনি।
তাঁর দাবি, অতিরিক্ত চারটি মরদেহ গোয়েন্দা শাখার অগ্রগামী সদস্যরা আগে থেকেই ঘটনাস্থলে নিয়ে গিয়ে গুলি করে হত্যা করেছিলেন এবং পরে সেগুলো মূল অভিযানের অংশ হিসেবে দেখানো হয়।
কটকা অভিযানে চারজনকে হত্যার অভিযোগ
২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে সুন্দরবনের কটকা এলাকায় আরেকটি অভিযানের কথাও বলেন সাব্বির রহমান।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, চরদুয়ানী থেকে একটি ট্রলারে পাঁচজন হাত বাঁধা ব্যক্তিকে তোলা হয়। মোহনার কাছে যাওয়ার পর চারজনকে একে একে ট্রলারের খোল থেকে বের করে একই পদ্ধতিতে হত্যা করা হয় বলে দাবি করেন তিনি।
তাঁদের মাথায় গুলি করে পেট কেটে সিমেন্টভর্তি বস্তাসহ পানিতে ফেলে দেওয়া হয় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন সাব্বির।
পঞ্চম ব্যক্তিকে পরে ট্রলার থেকে নামিয়ে দুই গোয়েন্দা সদস্যের সঙ্গে জিয়াউল আহসান বনের ভেতরে নিয়ে যান বলে জানান তিনি। কিছুক্ষণ পর বনের ভেতর থেকে গুলির শব্দ শোনা যায়। পরে জিয়াউল ও দুই সদস্য ফিরে আসেন।
অভিযান শেষে স্থানীয় পুলিশের উপস্থিতিতে অস্ত্র ও গোলাবারুদের পাশাপাশি চারটি মরদেহ উদ্ধারের কথা জানানো হয়। এর মধ্যে তিনটি মরদেহ শনাক্ত করা গেলেও একটি অজ্ঞাত ছিল। ওই অজ্ঞাত মরদেহটি বনে নিয়ে যাওয়া পঞ্চম ব্যক্তির হতে পারে বলে ধারণা করেন সাব্বির।
মরা ভোলা অভিযান নিয়েও জবানবন্দি
২০১২ সালের মার্চে সুন্দরবনের ভোলা নদীসংলগ্ন মরা ভোলা এলাকায় আরেকটি অভিযানের কথাও জানান সাব্বির রহমান।
তাঁর ভাষ্য, অভিযানের আগের রাতে গোয়েন্দা শাখার একটি দল ঘটনাস্থলের দিকে যায়। পরদিন মূল দল সেখানে পৌঁছে এলাকা ঘিরে ফেলার সময় বনের ভেতর থেকে দুই-তিন রাউন্ড গুলির শব্দ শোনা যায়।
এরপর জিয়াউলের নির্দেশে প্রায় ৩০ মিনিট বনের দিকে গুলি চালানো হয়। ফায়ারিং শেষ হওয়ার পর স্থানীয় পুলিশের মাধ্যমে তল্লাশি চালিয়ে অস্ত্র, গোলাবারুদ ও পাঁচটি মরদেহ উদ্ধারের কথা দেখানো হয় বলে জানান তিনি।
সাব্বিরের দাবি, এসব অভিযানে ঢাকার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরাও উপস্থিত থাকতেন। সাংবাদিকদের বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরিয়ে আলাদা ট্রলারে করে অভিযানের এলাকায় নেওয়া হতো। পরে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাঁদের নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করতেন।
তাঁর বক্তব্য, তিনটি অভিযানের ক্ষেত্রেই আগে থেকে গোয়েন্দা সদস্যদের ঘটনাস্থলে পাঠানো, হুইসেলের সংকেত, স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের গুলির শব্দ এবং অভিযান চলাকালে কিছু কর্মকর্তার নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়া চলাফেরার বিষয়গুলো তাঁর কাছে অভিযানগুলো সাজানো হওয়ার সন্দেহ তৈরি করে।
র্যাব ছাড়ার সিদ্ধান্ত
জবানবন্দির শেষদিকে সাব্বির রহমান বলেন, র্যাবে দায়িত্ব পালনের সময় এসব ঘটনা নিয়ে তাঁর মানসিক অস্বস্তি তৈরি হলেও ইউনিফর্মধারী বাহিনীর প্রচলিত আদেশ পালনের নীতির কারণে অনেক ক্ষেত্রে তিনি নির্দেশ মানতে বাধ্য হন।
তিনি জানান, চাকরির ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার পর স্বেচ্ছায় অবসর নেওয়ার জন্য আবেদন করেন। প্রক্রিয়া শেষে ২০১৩ সালের আগস্টে নিজ বাহিনীতে ফেরার আদেশ পান। পরে ২০১৪ সালের মার্চে অবসর প্রস্তুতিমূলক ছুটিতে (এলপিআর) যান।
সাক্ষীর দাবি, র্যাবে দায়িত্ব পালনের সময় তাঁর জানামতে জিয়াউল আহসান বরিশাল অঞ্চল ব্যবহার করে প্রায় ১৫ থেকে ২০ বার ‘গলফ অপারেশন’ পরিচালনা করেন।
মামলার একমাত্র আসামি জিয়াউল আহসান বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। বৃহস্পতিবার জবানবন্দি দেওয়ার সময় তিনি ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন। মামলাটিতে এর আগে আরও কয়েকজন সাবেক সামরিক ও র্যাব কর্মকর্তা সাক্ষ্য দিয়েছেন।
