ভারত-ইইউ বাণিজ্য চুক্তি: বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের উপর কি প্রভাব পড়বে?

ভারত ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সই করেছে। এই চুক্তির মাধ্যমে ভারতীয় পণ্য, বিশেষ করে পোশাক, ইউরোপের বাজারে বিশেষ শুল্ক সুবিধা পাবে।

ভারতের আশা, এর ফলে মার্কিন শুল্কের প্রভাব কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে এবং একই সঙ্গে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের অংশীদারিতে টক্কর দেওয়া যাবে।

গত মঙ্গলবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডের লিয়েন এবং ইউরোপিয়ান কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা এই চুক্তি সইয়ের ঘোষণা দেন। ইউরোপীয় কাউন্সিল, ইউরোপীয় পার্লামেন্ট ও ভারতের সংসদের অনুমোদন পেলে ২০২৭ সাল নাগাদ এটি কার্যকর হতে পারে।

এই চুক্তির আওতায় ভারত থেকে ইউরোপের ২৭ দেশে রপ্তানিকৃত পণ্যের অধিকাংশই শুল্ক সুবিধা পাবে। বিশেষ করে ভারতীয় পোশাকের ওপর ইউরোপে বিদ্যমান প্রায় ১২ শতাংশ শুল্ক শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে। এছাড়া চামড়াজাত পণ্য, সামুদ্রিক খাদ্য, হস্তশিল্প ও গয়নার মতো পণ্যের শুল্কও কমবে বা বিনাশুল্কে প্রবেশাধিকার মিলবে।

বিশ্লেষকদের ধারণা, এই চুক্তির ফলে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির একটি বড় অংশ ভারতের দখলে চলে যেতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ ইউরোপের বাজারে সর্বনিম্ন শুল্ক সুবিধা (এলডিসি ভিত্তিতে) পেয়ে আসছে এবং চীনের পরে ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক সরবরাহকারী দেশে পরিণত হয়েছে। ডেনিম, ট্রাউজার ও টি-শার্টের মতো কিছু পণ্যে বাংলাদেশ চীনকেও পিছনে ফেলেছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির পরিমাণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির ৫০ শতাংশের বেশি, অর্থাৎ প্রায় ১ হাজার ৯৭১ কোটি ডলারের পোশাক ইইউ দেশগুলোতে রপ্তানি হয়েছে।

ইইউ-ভারত চুক্তির পর ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়াল দাবি করেন, এই চুক্তির সুবাদে ভারত ইউরোপে পোশাক রপ্তানি ৭ বিলিয়ন ডলার থেকে বাড়িয়ে ৩০ থেকে ৪০ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যেতে পারবে।

তিনি বাংলাদেশের উদাহরণ টেনে বলেন, “বাংলাদেশ কীভাবে ইউরোপে এত বেশি রপ্তানি করে, তা নিয়ে আমাদের সব সময় জিজ্ঞাসা করা হতো। তারা শুল্কমুক্ত সুবিধা পেয়ে ৩০ বিলিয়ন ডলারের বাজার দখল করেছিল।”

বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ইউরোপের বাজারে ভারতীয় পোশাক রপ্তানি বৃদ্ধি পেলে প্রতিযোগিতামূলক দাম ও পণ্যের মানের কারণে বাংলাদেশকে চাপের মুখে পড়তে হতে পারে।

এই প্রসঙ্গে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের একজন নেতা বলেন, “ভারতের চেয়ে তৈরি পোশাক শিল্পে বাংলাদেশ ৪০ বছর এগিয়ে। দর, কাজের মান ও সক্ষমতার দিক থেকে আমরা তাদের চেয়ে শক্ত অবস্থানে আছি। তারা চাইলেই আমাদের মত বড় পরিসরে রপ্তানির সক্ষমতায় অতি দ্রুত যেতে পারবে না, এতে অনেক সময় লাগবে। ক্রেতারা (বায়াররা) সহজে তাদের দিকে ঝুঁকবেন না।

ভারত ইইউতে যেসব পণ্য রপ্তানি করে, তার সঙ্গে আমাদের পণ্যের মিল খুবই কম। আমরা সাধারণত নিম্ন ও মধ্যম মানের পোশাক তৈরি করি। শুধু নিটওয়্যারে প্রায় সমান সমান। তাই আমাদের সজাগ থাকতে হবে।”

তবে তিনি স্বীকার করেন যে প্রতিযোগিতা বাড়লে কিছু চাপ আসতে পারে। “ক্রেতাদের কাছ থেকে দাম কমাতে বলা নিয়ে ১০-১২ শতাংশ চাপ আসতে পারে। তবে এটা নিয়ে স্পষ্ট বলা এখনই সম্ভব নয়,” বলেছেন তিনি।

তিনি আরও যোগ করেন, এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শিল্পের সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে হবে। “খরচ কমানোর আর্থিক দিকগুলো খতিয়ে দেখতে হবে, যেমন ঋণের সুদের হার কমানো এবং নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

ভারত প্রায় এক যুগ ধরে চেষ্টা করে ইউরোপের বাজারে এই সুবিধা পেতে যাচ্ছে। আমাদেরও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিতে হবে। ভারত কর্মসংস্থানের জন্য বস্ত্র খাতে নানা রকম প্রণোদনা দিয়ে আসছে অনেক দিন ধরে। আমাদেরও উপায় বের করতে হবে।”