ক্ষমতার অপব্যবহারে পূর্বাচল প্লট দুর্নীতি: শেখ হাসিনার পরিবারসহ ৩৬ জনের কারাদণ্ড

ক্ষমতার অপব্যবহার ও তথ্য গোপনের মাধ্যমে রাজধানীর পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে প্লট বরাদ্দ নেওয়ার ঘটনায়, ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবারের বিরুদ্ধে আরও দুটি দুর্নীতি মামলার রায় ঘোষণা করেছে আদালত।

এ রায়ে শেখ হাসিনাসহ তার ভাগ্নে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববি, ভাগ্নি আজমিনা হক সিদ্দিক রূপন্তী এবং ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিকসহ মোট ৩৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অবৈধভাবে বরাদ্দ পাওয়া প্লট বাতিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ঢাকার চতুর্থ বিশেষ জজ আদালতের বিচারক রবিউল আলম সোমবার পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে প্লট বরাদ্দ সংক্রান্ত দুর্নীতির দুই মামলার রায় ঘোষণা করেন। একটি মামলা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাগ্নে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববির নামে বরাদ্দ নেওয়া প্লট নিয়ে এবং অন্যটি তার ছোট বোন আজমিনা হক সিদ্দিক রূপন্তীর প্লট সংক্রান্ত।

রায়ে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববি ও আজমিনা হক সিদ্দিক রূপন্তীকে সাত বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রতিটি মামলায় পাঁচ বছর করে মোট ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এছাড়া ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিককে দুই বছর করে মোট চার বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

আদালত রায়ে উল্লেখ করেন, ঢাকায় নিজস্ব ফ্ল্যাট ও আবাসন সুবিধা থাকা সত্ত্বেও তথ্য গোপন করে আইন লঙ্ঘনের মাধ্যমে পূর্বাচল প্রকল্পে ১০ কাঠা করে প্লট বরাদ্দ নেওয়া হয়। এসব প্লট বরাদ্দে শেখ হাসিনা ক্ষমতার অপব্যবহার করে সহায়তা করেন এবং টিউলিপ সিদ্দিক খালা হিসেবে তার প্রভাব ব্যবহার করে বরাদ্দ প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখেন।

দুদকের দায়ের করা প্রতিটি মামলায় ১৮ জন করে মোট ৩৬ জন আসামি ছিলেন। তাদের মধ্যে রাজউকের সাবেক সদস্য (এস্টেট ও ভূমি) মোহাম্মদ খুরশীদ আলম একমাত্র গ্রেপ্তারকৃত আসামি হিসেবে আদালতে উপস্থিত ছিলেন। তাকে দুই মামলায় এক বছর করে মোট দুই বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। অন্য আসামিদের পাঁচ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া মামলার সব আসামিকে এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড, অনাদায়ে ছয় মাসের কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ববি ও রূপন্তীর নামে পূর্বাচলে বরাদ্দ পাওয়া দুটি প্লট বাতিলের নির্দেশ দেন আদালত।

রায় ঘোষণার সময় শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা, টিউলিপ সিদ্দিকসহ অধিকাংশ আসামি পলাতক থাকায় তাদের অনুপস্থিতিতেই বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। ফলে তাদের পক্ষে কোনো আইনজীবী আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পাননি।

রায়ের পর দুর্নীতি দমন কমিশনের কৌঁসুলি খান মো. মঈনুল হাসান লিপন বলেন, কমিশন সর্বোচ্চ সাজা প্রত্যাশা করেছিল। রায় পর্যালোচনা করে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হয় শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার। এরপর থেকেই পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে শেখ হাসিনার পরিবার ও ঘনিষ্ঠদের নামে ছয়টি প্লট বরাদ্দে অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসে।

এই অভিযোগের ভিত্তিতে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দুর্নীতি দমন কমিশন ছয়টি পৃথক মামলা দায়ের করে। মামলাগুলোতে শেখ হাসিনা, তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল, বোন শেখ রেহানা, ভাগ্নে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববি এবং ভাগ্নি আজমিনা হক সিদ্দিক রূপন্তীসহ পরিবারের একাধিক সদস্যকে আসামি করা হয়।

এর আগে চারটি মামলায় রায় ঘোষণার মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে মোট ২৬ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। সোমবার ঘোষিত দুটি রায়ের মধ্য দিয়ে পূর্বাচল প্লট দুর্নীতির ছয়টি মামলারই বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলো।