চব্বিশের গণআন্দোলনের সময় রাজধানীর চানখাঁরপুলে ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া রায় পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন শহীদ পরিবারের সদস্যরা। তবে আইনজীবীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ থাকলেও পুনর্বিবেচনার কোনো বিধান নেই।
চানখাঁরপুলে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায়ের বিরুদ্ধে স্মারকলিপি দিয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নিহতদের পরিবারের সদস্যরা। মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রারের কাছে এই স্মারকলিপি জমা দেন ২০২৪ সালের অগাস্টে নিহত আট শহীদের পরিবারের আটজন সদস্য।
স্মারকলিপিতে স্বাক্ষর করেন আন্দোলনে শহীদ মীর মুগ্ধর বড় ভাই মীর মাহমুদুর রহমান দীপ্তসহ অন্যান্য শহীদ পরিবারের সদস্যরা।
এর এক দিন আগে, সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ চানখাঁরপুলে ছয় হত্যার মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে আট আসামির মধ্যে তিনজন পুলিশ কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন—
ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী এবং রমনা বিভাগের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার শাহ আলম মো. আখতারুল ইসলাম।
এ ছাড়া মামলার অন্য আসামিদের মধ্যে রমনা বিভাগের সাবেক সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ ইমরুলকে ছয় বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। শাহবাগ থানার সাবেক পরিদর্শক আরশাদ হোসেনকে দেওয়া হয়েছে চার বছরের কারাদণ্ড। একই থানার তিন কনস্টেবল মো. সুজন হোসেন, ইমাজ হোসেন ইমন ও নাসিরুল ইসলামকে তিন বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
স্মারকলিপিতে বলা হয়, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত সহিংসতায় যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তারা ইতিহাসে শহীদ হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তবে চানখাঁরপুলের ঘটনায় দেওয়া রায় শহীদ পরিবারগুলোর মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও হতাশা তৈরি করেছে।
রায়ের প্রতি অসন্তোষের পেছনে চারটি কারণ তুলে ধরেন শহীদ পরিবারের সদস্যরা।
তারা বলেন, ঘটনার সুস্পষ্ট ভিডিও ফুটেজ থাকা সত্ত্বেও রায়ে তার যথাযথ প্রতিফলন নেই। এটি ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং আইনগতভাবে সংগত নয়।
এ ছাড়া মূল অপরাধীদের যথাযথ শাস্তি না দিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ায় ভবিষ্যতে এই রায় টিকবে কি না, সে বিষয়ে সন্দেহ রয়েছে বলেও স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়।
তাদের অভিযোগ, রায়টি জুলাই আন্দোলনের চেতনার পরিপন্থি। এর ফলে প্রায় ১ হাজার ৪০০ শহীদ পরিবারের সদস্যরা চরমভাবে মর্মাহত ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছেন।
এ ছাড়া ভবিষ্যতে এই রায় একটি নেতিবাচক নজির হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে, যা মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়ায় অনাকাঙ্ক্ষিত প্রভাব ফেলবে—এমন আশঙ্কাও প্রকাশ করা হয়।
এ বিষয়ে দণ্ডিত কনস্টেবল ইমাজ হোসেনের আইনজীবী জিয়াউর রশিদ টিপু বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ আছে। তবে রিভিউ বা পুনর্বিবেচনার কোনো বিধান নেই।
প্রসিকিউটর মো. মিজানুল ইসলাম বলেন, “রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা যাবে, কিন্তু রিভিউয়ের সুযোগ নেই। আমরা আপিলের প্রস্তুতি নিচ্ছি।”
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে রায় ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে আপিল দায়ের করতে হয়। আপিল দায়েরের পর ৬০ দিনের মধ্যে তা নিষ্পত্তির বিধান রয়েছে।
