জাতীয় কর কাঠামো পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত কমিটি দেশের কর-জিডিপি অনুপাত কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় উন্নীত করতে এবং সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়ক নীতি প্রণয়নের লক্ষ্যে একটি প্রতিবেদন পেশ করেছে। এতে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ব্যবস্থায় বহু হারের পরিবর্তে একক হারের দিকে অগ্রসর হওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বাংলাদেশের কর ব্যবস্থাকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে জটিল, অদক্ষ এবং পরোক্ষ করের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল বলে উল্লেখ করা হয়। কমিটি মনে করে, খণ্ডিত পরিবর্তনের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে কর ব্যবস্থার মৌলিক ও কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন।
‘ট্যাক্স পলিসি ফর ডেভেলপমেন্ট: আ রিফর্ম এজেন্ডা ফর রিস্ট্রাকচারিং দ্য ট্যাক্স সিস্টেম’ শীর্ষক এই প্রতিবেদনে মোট ৫৫টি নীতিগত বিষয় চিহ্নিত করে সেগুলোর জন্য সুপারিশ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে অগ্রাধিকারভিত্তিক সাতটি নীতিগত বিষয় রয়েছে।
প্রতিবেদনে ২০৩০ সালের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ১০-১২ শতাংশ এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে ১৫-২০ শতাংশে উন্নীত করার রূপরেখা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া কাঠামোগত পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ করের অনুপাত বর্তমান ৩০:৭০ থেকে ৫০:৫০ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
অন্যান্য উল্লেখযোগ্য সুপারিশের মধ্যে রয়েছে:
· কর প্রশাসনের ডিজিটালাইজেশন, অটোমেশন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ঝুঁকি বিশ্লেষণ।
· সহজ কর কাঠামো ও প্রণোদনা পুনর্গঠন।
· ঝুঁকিভিত্তিক অডিট ব্যবস্থা চালু করা।
· বাণিজ্য কর থেকে সরে এসে দেশীয় করের দিকে কৌশলগত পরিবর্তন।
· শুল্ক কাঠামো আধুনিকায়ন এবং রপ্তানি-আমদানির বিকল্প পণ্যের কার্যকর সুরক্ষা সমান করা।
· পণ্য খালাসের ক্ষেত্রে আলাদা ‘ভ্যালুয়েশন ডেটাবেজের’ প্রয়োজন নেই উল্লেখ করে বন্দরের পরিবর্তে পণ্য ছাড়ের পর নিরীক্ষার সুপারিশ।
কমিটির চেয়ারম্যান জায়েদী সাত্তারের নেতৃত্বে কমিটির সদস্যরা প্রতিবেদনটি প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে হস্তান্তর করেন। কমিটিতে সুলতান হাফিজ রহমান, সৈয়দ মইনুল আহসান, মোহাম্মদ জাহিদ হোসাইন, খুরশীদ আলম, মাহতাব উদ্দিন আহমেদ, সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর, মুহাম্মদ মেহেদী হাসান, শাহ মো. আব্দুল খালেক, স্নেহাশীষ বড়ুয়া এবং সদস্য সচিব মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান পাটওয়ারীসহ মোট ১১ জন সদস্য ছিলেন।
প্রতিবেদন গ্রহণকালে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের হাতে সময় সীমিত থাকলেও তারা এসব নীতির বাস্তবায়নের পথচলা শুরু করতে চান। তার আশা, এই নীতিগুলো বাস্তবায়িত হলে রাজস্ব আদায়ের খাত ও পদ্ধতি আরও স্পষ্ট হবে এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় একটি বড় নীতিগত পরিবর্তন আসবে।
অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, এই প্রতিবেদন রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি ও এ খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে গাইডলাইন হিসেবে কাজ করবে।
কমিটির প্রধান জায়েদী সাত্তার বলেন, গত এক দশকে রাজস্ব আদায়ের পদ্ধতি অত্যন্ত জটিল হয়ে গেছে এবং এসব পদ্ধতির সংস্কার ছাড়া রাজস্ব আদায়ের পরিসর বাড়ানো কঠিন। দ্রুত সংস্কার করা গেলে অর্থনীতিতে এর সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিব বলেছেন, প্রতিবেদনে সংকটগুলো স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং সেগুলো নিরসনের পথনির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদন হস্তান্তর অনুষ্ঠানে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ, অর্থ বিভাগ ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিবগণও উপস্থিত ছিলেন।
