আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটারদের রাজনৈতিক পছন্দে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। নতুন এক জরিপে দেখা গেছে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সমর্থকদের প্রায় ৪৮ শতাংশ আগামী নির্বাচনে বিএনপিকে সমর্থন করতে পারেন। একই সঙ্গে বাকি ৫২ শতাংশ ভোটার অন্য কোনো প্রার্থীর দিকে ঝুঁকতে পারেন বলে জরিপে উঠে এসেছে।
বুধবার সকালে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘আনকাভারিং দ্য পাবলিক পালস’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে এই জরিপ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনে ভোটারদের রাজনৈতিক মনোভাব, অগ্রাধিকার, নেতৃত্ব সম্পর্কে ধারণা এবং সামগ্রিক নির্বাচনি পরিবেশ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। জরিপটি যৌথভাবে পরিচালনা করে কমিউনিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন (সিআরএফ) এবং বাংলাদেশ ইলেকশন অ্যান্ড পাবলিক ওপিনিয়ন স্টাডিজ। জরিপের মূল তথ্য উপস্থাপন করেন সিআরএফের স্ট্র্যাটেজিক কো-অর্ডিনেটর জাকারিয়া পলাশ।
জরিপে আরও দেখা গেছে, ২০০৮ সালের পর প্রথমবার ভোট দিতে যাওয়া নতুন ভোটারদের মধ্যে ৩৭ দশমিক ৪ শতাংশ জামায়াতে ইসলামীর প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এতে করে তরুণ ও নতুন ভোটারদের রাজনৈতিক ঝোঁক নিয়েও নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে।
ভোটে অংশগ্রহণের আগ্রহের দিক থেকে জরিপে ইতিবাচক চিত্র উঠে এসেছে। অংশগ্রহণকারী ভোটারদের ৯০ শতাংশের বেশি জানিয়েছেন, তারা আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিতে আগ্রহী। তবে প্রায় ৮ শতাংশ ভোটার এখনও সিদ্ধান্তহীন অথবা ভোট না দেওয়ার কথা বলেছেন। লিঙ্গ, বয়স কিংবা শহর-গ্রামভেদে ভোটদানের আগ্রহে বড় কোনো পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়নি।
ভোটারদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে উঠে এসেছে দুর্নীতি ও সুশাসন। জরিপে অংশ নেওয়া ৬৭ দশমিক ৩ শতাংশ ভোটার দুর্নীতিকে দেশের প্রধান সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। পাশাপাশি ৩৫ দশমিক ৯ শতাংশ ভোটার ধর্মকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে দেখছেন। তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিচয় বা ধর্মীয় ইস্যুর চেয়ে শাসনব্যবস্থা, স্বচ্ছতা ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো ভোটারদের কাছে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
নেতৃত্বের বিষয়ে ভোটারদের প্রত্যাশাও জরিপে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। বয়স ও লিঙ্গ নির্বিশেষে অধিকাংশ ভোটার জানিয়েছেন, তারা এমন নেতৃত্ব চান যিনি সাধারণ মানুষের কথা ভাবেন এবং কার্যকর ও দৃঢ়ভাবে দেশ পরিচালনা করতে সক্ষম। ব্যক্তিগত ক্যারিশমার চেয়ে সহমর্মিতা, জবাবদিহি ও শাসনক্ষমতাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন তারা।
রাজনৈতিক তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে টেলিভিশন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে সবচেয়ে প্রভাবশালী উৎস হিসেবে চিহ্নিত করেছেন ভোটাররা। জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ ভোটার একক কোনো মাধ্যমের ওপর নির্ভর না করে একাধিক উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করেন, যা প্রথাগত ও ডিজিটাল মিডিয়ার যৌথ ব্যবহারের প্রবণতা নির্দেশ করে।
জরিপে নির্বাচনের দিনের নিরাপত্তা নিয়েও ভোটারদের উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে। ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা, ভয়ভীতি প্রদর্শন, ভোট কারচুপি ও ব্যালট ভর্তির আশঙ্কা প্রায় সব রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের মধ্যেই রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে দলীয় পরিচয়ের চেয়ে প্রার্থীর গুরুত্ব বাড়ছে। জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ভোটার জানিয়েছেন, তারা ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় প্রার্থীকে গুরুত্ব দেন। এর মধ্যে ৩০ দশমিক ২ শতাংশ ভোটার শুধু প্রার্থীর ভিত্তিতে ভোট দেন, আর ৩৩ দশমিক ২ শতাংশ ভোটার প্রার্থী ও দল—উভয় বিষয় বিবেচনায় রাখেন।
এই জরিপটি সারা দেশের ১১ হাজার ৩৮ জন ভোটারের অংশগ্রহণে পরিচালিত হয়। স্তরভিত্তিক দ্বৈবচয়ন পদ্ধতিতে ২০২৫ সালের ২০ নভেম্বর থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দুই ধাপে মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
