যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান সংঘাত এবং শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের সম্ভাবনা

সম্প্রতি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্মিলিত সামরিক অভিযানের পরও দেশটির অভ্যন্তরীণ শাসনকাঠামোতে তাৎক্ষণিক কোনো পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছেন না মার্কিন গোয়েন্দা বিশ্লেষকরা। যদিও হোয়াইট হাউসের বক্তব্যে ইরানের জনগণের প্রতি স্বাধীনতার বার্তা দেওয়া হয়েছে, বাস্তবে ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা উৎখাতের সক্ষমতা নিয়ে ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরেই গভীর সংশয় রয়েছে।

শীর্ষ নেতৃত্ব হারানোর পরবর্তী পরিস্থিতি

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের জনগণকে সরকার উৎখাতের আহ্বান জানালেও গোয়েন্দা বিশ্লেষণ বলছে, খামেনির মৃত্যু বা অপসারণের পর দেশটির নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) কট্টরপন্থি শীর্ষ কর্মকর্তারা। সিআইএর মূল্যায়নে বলা হয়েছে, আইআরজিসির সদস্যরা বর্তমান ব্যবস্থার প্রধান সুবিধাভোগী হওয়ায় তাদের পক্ষ পরিবর্তনের সম্ভাবনা ক্ষীণ। এমনকি জানুয়ারির সরকারবিরোধী বিক্ষোভের সময়ও আইআরজিসির কেউ বিদ্রোহ বা পক্ষত্যাগ করেনি, যা একটি সফল বিপ্লবের জন্য অত্যন্ত জরুরি।

অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা

ইরানের জনগণের একটি অংশের কাছে শাসকগোষ্ঠী অজনপ্রিয় হলেও নিরাপত্তা বাহিনী ও আইআরজিসির অনুগত সদস্যরা রাষ্ট্রযন্ত্রের পুরো নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রেখেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজিশকিয়ানের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী নেতৃত্ব পরিষদ গঠন করা হয়েছে, যেখানে বিচার বিভাগ ও প্রভাবশালী গার্ডিয়ান কাউন্সিলের প্রতিনিধিরা রয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে ইরান তার অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও নেতৃত্ব ধরে রাখার চেষ্টা করছে।

বিচ্ছিন্নতাবাদ ও প্রতিরোধের হুঁশিয়ারি

ইরানের নিরাপত্তা প্রধান আলি লারিজানি সম্প্রতি সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানকে ভেঙে টুকরো টুকরো করার পরিকল্পনা করছে। তিনি বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, যেকোনো ধরনের বিচ্ছিন্নতাবাদী পদক্ষেপ নির্মমভাবে দমন করা হবে। সম্প্রতি ইসরায়েলি বিমান হামলায় একটি বেসামরিক স্কুলে হতাহতের ঘটনা দেশটির অভ্যন্তরে ক্ষোভ বাড়ালেও তা সরকার পতনের পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

গোয়েন্দা মহলের দ্বিধা ও পশ্চিমা সমর্থনের সীমাবদ্ধতা

মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংসের মাত্রা এবং নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে মতভেদ রয়েছে। পাশাপাশি, ট্রাম্পের দূত নির্বাসিত ইরানি শাহজাদা রেজা পাহলভির সঙ্গে আলোচনা করলেও তাকে ইরানের জনগণ ও প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা মেনে নেবে, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা জনাথন পেনিকফ মনে করেন, ইরানের জনগণের বিদ্রোহ তখনই সফল হতে পারে, যদি শাসকগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ তাদের সঙ্গে সংহতি জানায়। অন্যথায়, সশস্ত্র বাহিনী ক্ষমতা ধরে রাখতে অস্ত্র ব্যবহার করবে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বাইরের হামলার মাধ্যমে ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করা কেবল কঠিনই নয়, বরং তা দেশটিকে দীর্ঘমেয়াদি গৃহযুদ্ধের দিকেও নিয়ে যেতে পারে। ধর্মীয় ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর গভীর প্রোথিত কাঠামো এবং আইআরজিসির অনুগত বাহিনী বর্তমান ব্যবস্থার টিকে থাকার প্রধান কারণ। ইরানের ভবিষ্যৎ এখন নির্ভর করছে শাসকগোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ ঐক্য এবং জনগণের দীর্ঘদিনের দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার সক্ষমতার ওপর।