ইরানের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে থাকা সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এক যৌথ মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় নিহত হয়েছেন বলে তেহরান থেকে জানানো হয়েছে। রাষ্ট্রীয় সূত্রের দাবি, শনিবার ভোরে তার কম্পাউন্ডে চালানো বিমান হামলায় তিনি এবং তার পরিবারের কয়েকজন সদস্য প্রাণ হারান। তার বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর।
ঘটনার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, উন্নত গোয়েন্দা নজরদারি ও ট্র্যাকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে লক্ষ্য নির্ধারণ করে এ হামলা চালানো হয়। ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সি খামেনিকে “শহীদ” আখ্যা দিয়ে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
বিপ্লব থেকে রাষ্ট্রশক্তি: দীর্ঘ পথচলা
খামেনির রাজনৈতিক উত্থানকে বোঝার জন্য ফিরে যেতে হয় ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবে, যার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন আয়াতুল্লাহ রুহল্লাহ খোমেনি। রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে যে ইসলামিক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়, তার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ১৯৮৯ সালে দায়িত্ব নেন খামেনি।
এর আগে ইরান-ইরাক যুদ্ধের কঠিন সময়ে তিনি প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ওই যুদ্ধের অভিজ্ঞতা তার রাজনৈতিক দর্শনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে—বিশেষত পশ্চিমা শক্তির প্রতি অবিশ্বাস। যুদ্ধকালে পশ্চিমা দেশগুলো সাদ্দাম হুসেইন-এর ইরাককে সমর্থন দেওয়ায় খামেনির মনে নিরাপত্তা-নির্ভর রাষ্ট্রব্যবস্থার ধারণা শক্ত হয়।
‘প্রতিরোধ অর্থনীতি’ ও শক্ত রাষ্ট্রব্যবস্থা
তার নেতৃত্বে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর বা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) কেবল সামরিক শক্তি নয়, বরং অর্থনীতি ও রাজনীতিতেও প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার জবাবে তিনি ‘প্রতিরোধ অর্থনীতি’ নীতির পক্ষে অবস্থান নেন—স্বনির্ভরতা, অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও নিরাপত্তা অগ্রাধিকার পায়।
সমালোচকদের মতে, এই নীতির ফলে প্রতিরক্ষা খাতে জোর বাড়লেও সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার বাধাগ্রস্ত হয়। ২০০৯ সালের নির্বাচনী বিতর্ক, ২০২২ সালের নারী অধিকার আন্দোলন এবং সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক বিক্ষোভ—সব ক্ষেত্রেই কঠোর দমন-পীড়ন নীতি অনুসরণ করা হয়।
আদর্শ বনাম বাস্তবতা: এক বিভক্ত সমাজ
ইরান বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও Iran Grand Strategy: A Political History বইয়ের লেখক ওয়ালি নাসর মনে করেন, খামেনি আদর্শগতভাবে বিপ্লব, ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদকে অবিচ্ছেদ্য হিসেবে দেখতেন। কিন্তু তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বৈশ্বিক সংযোগে বেশি আগ্রহী ছিল।
ফলে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা-প্রধান নীতির সঙ্গে সমাজের একটি অংশের প্রত্যাশার দূরত্ব বাড়তে থাকে। জাতীয় স্বাধীনতার প্রশ্নে তার অনমনীয় অবস্থান অনেক ইরানির কাছে গর্বের হলেও, অর্থনৈতিক দুর্দশা সেই গর্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
কী বদলাবে?
খামেনির মৃত্যু কেবল একজন নেতার প্রস্থান নয়; এটি ইরানের ক্ষমতার কাঠামোর জন্য এক বড় পরীক্ষা।
১. ক্ষমতার উত্তরাধিকার: ইরানের সংবিধান অনুযায়ী বিশেষ পরিষদ নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করবে। তবে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় আইআরজিসির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
২. আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধি: ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের ঝুঁকি বাড়বে। মধ্যপ্রাচ্যে প্রক্সি সংঘাত নতুন মাত্রা পেতে পারে।
৩. অভ্যন্তরীণ পুনর্বিন্যাস: একদিকে শোক ও জাতীয়তাবাদী আবেগ, অন্যদিকে সংস্কারপন্থীদের নতুন করে সংগঠিত হওয়ার সম্ভাবনা—দুই ধারাই জোরদার হতে পারে।
ইতিহাসের মোড় ঘোরানো মুহূর্ত?
১৯৩৯ সালে মাশহাদে জন্ম নেওয়া খামেনি ছাত্রজীবন থেকেই পাহলভি শাসনের বিরোধিতায় যুক্ত ছিলেন। ব্রিটিশ এমআইসিক্স ও মার্কিন সিআইএর সহায়তায় ১৯৫৩ সালে প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেক-এর পতন তার রাজনৈতিক চেতনায় গভীর ছাপ ফেলে। সাভাকের হাতে গ্রেপ্তার, নির্বাসন, এবং পরে বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা—তার জীবনপথ ছিল সংঘাতময়।
এখন প্রশ্ন হলো, তার অবর্তমানে ইরান কি আরও কঠোর নিরাপত্তা-কেন্দ্রিক পথে হাঁটবে, নাকি নতুন নেতৃত্ব আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সম্পর্ক পুনর্বিবেচনা করবে?
খামেনির মৃত্যু মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। তবে এই অধ্যায় শান্তি নাকি সংঘাতের—তা নির্ভর করবে তেহরান, ওয়াশিংটন ও তেলআবিবের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।
