মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় নিহত বেসামরিকদের মধ্যে অধিকাংশই দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের নাগরিক—যা প্রবাসী শ্রমশক্তির নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
আমিরাত কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক হামলায় প্রাণ হারানো ছয়জন বেসামরিকের মধ্যে তিনজন পাকিস্তানের নাগরিক। এছাড়া একজন বাংলাদেশি, একজন নেপালি এবং একজন ফিলিস্তিনি নাগরিক রয়েছেন। নিহতদের মধ্যে একমাত্র বাংলাদেশি আহমেদ আলী, যিনি মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার গাজিটেকা গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন।
এই ঘটনার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত সরাসরি প্রভাব ফেলছে প্রবাসী শ্রমিকদের ওপর। বিভিন্ন নির্মাণ, সেবা ও শিল্প খাতে কর্মরত দক্ষিণ এশিয়ার বিপুল সংখ্যক শ্রমিক এখন নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
এদিকে, বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাত শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত পাঁচ বাংলাদেশির মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে একজন দুবাইয়ে, একজন বাহারাইনে এবং তিনজন সৌদি আরবে প্রাণ হারিয়েছেন। এসব মৃত্যু দেখিয়ে দিচ্ছে, সংঘাতের বিস্তৃতি শুধু একটি দেশে সীমাবদ্ধ নেই; বরং গোটা উপসাগরীয় অঞ্চলে এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৭ মার্চ ইরানের ছোড়া ১০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ৪৫টি ড্রোন তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সফলভাবে প্রতিহত করেছে। শুধু একদিনই নয়, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত মোট ৩১৪টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ১৫টি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১,৬৭২টি ড্রোন প্রতিহত করার দাবি করেছে দেশটি।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার এই সক্ষমতা আংশিক স্বস্তি দিলেও পুরোপুরি ঝুঁকি কমায়নি। কারণ প্রতিটি হামলা প্রতিহত করা সম্ভব হলেও বিচ্ছিন্নভাবে প্রাণহানির ঘটনা ঘটছেই—যার শিকার হচ্ছেন মূলত নিরীহ বেসামরিক নাগরিকরা।
এছাড়া হামলায় আহতদের তালিকায়ও রয়েছে বহু দেশের নাগরিক। আমিরাত ছাড়াও বাংলাদেশ, মিশর, ইথিওপিয়া, ফিলিপাইন, পাকিস্তান, ভারত, শ্রীলঙ্কা, ইয়েমেনসহ অন্তত ১৫টির বেশি দেশের মানুষ আহত হয়েছেন। এতে বোঝা যায়, এই সংঘাত একটি বহুজাতিক মানবিক সংকটে রূপ নিচ্ছে।
পরিস্থিতির মধ্যে ১০ মার্চ আরেকটি দুর্ঘটনাও ঘটে, যেখানে আমিরাতের একটি সামরিক হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে দুই কর্মকর্তা নিহত হন। যদিও এটি সরাসরি হামলার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, বরং যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে বলে জানিয়েছে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।
সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এখন শুধু ভূ-রাজনৈতিক ইস্যুতে সীমাবদ্ধ নেই; এটি ধীরে ধীরে মানবিক সংকটে রূপ নিচ্ছে, যার বড় শিকার হচ্ছেন প্রবাসী শ্রমজীবী মানুষ। বিশেষ করে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য এটি একটি বড় সতর্কবার্তা—বিদেশে কর্মরত নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ আরও জোরদার করা এখন সময়ের দাবি।
