নিজস্ব প্রতিবেদক
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনা ও জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জরুরি ভিত্তিতে অতিরিক্ত তেল আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল ও অকটেন বিদেশ থেকে সরাসরি ক্রয় করা হবে, যার সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৪৬ কোটি টাকা।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি বিভাগের প্রস্তুত করা একটি সারসংক্ষেপ অনুযায়ী, দুবাইভিত্তিক জ্বালানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান পেট্রোগ্যাস ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশন থেকে এই জ্বালানি তেল আমদানির প্রস্তাব করা হয়েছে। বিষয়টি অনুমোদনের জন্য সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির কাছে পাঠানো হয়েছে।
সরাসরি ক্রয়ের প্রস্তাব
প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে ১ লাখ মেট্রিক টন ডিজেল এবং ২৫ হাজার মেট্রিক টন গ্যাসোলিন (অকটেন) আমদানি করা হবে। এতে মোট ব্যয় হতে পারে প্রায় ১৬ কোটি ৬৮ লাখ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় দুই হাজার কোটিরও বেশি।
সরকারি নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশে পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য আমদানি, মজুদ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিপণনের দায়িত্ব রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)-এর ওপর ন্যস্ত।
বিদ্যমান আমদানি পদ্ধতি
২০১৬ সাল থেকে বিপিসি সাধারণত দুটি পদ্ধতিতে জ্বালানি তেল সংগ্রহ করে থাকে। এর একটি হলো সরকারে-সরকারে চুক্তির মাধ্যমে আমদানি এবং অন্যটি আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে ক্রয়।
এই ব্যবস্থার আওতায় সৌদি আরব থেকে অপরিশোধিত তেল এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে মুরবান ধরনের অপরিশোধিত তেল আমদানি করা হয়। পরে এসব তেল দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড-এ প্রক্রিয়াজাত করা হয়।
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার
সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা শুরু হওয়ার পর জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। বিশেষ করে ইরান হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচলে সীমাবদ্ধতা আরোপ করলে বিশ্ববাজারে সরবরাহ ঝুঁকি তৈরি হয়।
এই পথ দিয়েই বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের জ্বালানি তেল পরিবহন করা হয়। ফলে পরিবহন ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার পাশাপাশি সরবরাহও অনিশ্চিত হয়ে ওঠে।
সীমিত মজুদ নিয়ে উদ্বেগ
জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মার্চের শুরুতে দেশে ডিজেলের মজুদ ছিল প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার মেট্রিক টন, যা দিয়ে প্রায় ১৩ দিনের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব।
অন্যদিকে মার্চ মাসে জ্বালানি তেল আমদানির জন্য খোলা একাধিক এলসির মধ্যে কিছু চালান এখনো দেশে পৌঁছায়নি। একইভাবে এপ্রিল মাসের চালানগুলোর ক্ষেত্রেও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
প্রিমিয়াম তুলনামূলক কম
সরকারি মূল্যায়নে দেখা গেছে, প্রস্তাবিত চালানের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজার সূচকের সঙ্গে প্রতি ব্যারেলে ৩ ডলার অতিরিক্ত প্রিমিয়াম যোগ করা হয়েছে। অতীতে আন্তর্জাতিক দরপত্রে ডিজেলের ক্ষেত্রে এই প্রিমিয়াম প্রায় ৪.৭২ থেকে ৪.৭৮ ডলার পর্যন্ত ছিল। অকটেনের ক্ষেত্রে তা প্রায় ৬ ডলার বা তারও বেশি হয়েছে।
সে তুলনায় বর্তমান প্রস্তাব তুলনামূলক কম প্রিমিয়ামে পাওয়া যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বিশেষ পরিস্থিতিতে সরাসরি ক্রয়
যদিও প্রস্তাবকারী প্রতিষ্ঠানটি বিপিসির নিয়মিত তালিকাভুক্ত সরবরাহকারী নয়, তবুও সরকারি ক্রয় আইনের বিধান অনুযায়ী জরুরি পরিস্থিতিতে সরাসরি ক্রয় করা সম্ভব। সেই বিধান অনুসরণ করেই প্রস্তাবটি মূল্যায়ন করা হয়েছে।
বিপিসির পরিচালনা পর্ষদের সাম্প্রতিক বৈঠকে এ বিষয়ে নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এখন চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য বিষয়টি সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য তখন আগাম মজুদ নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তবে একই সঙ্গে তারা বলছেন, সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি উৎস বৈচিত্র্যকরণ এবং কৌশলগত মজুদ বাড়ানোর দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন।
