‘রাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধী’ বিদ্যুৎ চুক্তির দায় এখন বর্তমান সরকারের কাঁধে: প্রতিমন্ত্রী

আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে করা একাধিক চুক্তিতে রাষ্ট্রের স্বার্থ যথাযথভাবে রক্ষা করা হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি বলেন, ওই চুক্তিগুলোর আর্থিক ও নীতিগত দায় এখন বর্তমান সরকারকে বহন করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা, ক্যাপাসিটি চার্জ, বিদ্যুৎ বিল, লোডশেডিং এবং প্রিপেইড মিটারের নানা জটিলতা নিয়েও সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন তিনি।

সোমবার (৬ জুলাই) রাজধানীর বিদ্যুৎ ভবনের বিজয় হলে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। এ সময় বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মিরানা মাহরুখ, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম এবং বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (বিআরইবি) চেয়ারম্যান এস এম জিয়া-উল-আজিম উপস্থিত ছিলেন।

সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকরা জুন মাসের বাড়তি বিদ্যুৎ বিল, লোডশেডিং, গ্রাম-শহরের বিদ্যুৎ সরবরাহের বৈষম্য, প্রিপেইড মিটারের জটিলতা, ক্যাপাসিটি চার্জ, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন করেন।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ২৯ হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি হলেও সাম্প্রতিক সময়ে সর্বোচ্চ উৎপাদন হয়েছে প্রায় ১৭ হাজার মেগাওয়াট। সর্বোচ্চ চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট ধরে ২০ শতাংশ রিজার্ভ রাখলেও এত বড় উৎপাদন সক্ষমতার প্রয়োজন ছিল না। এই অতিরিক্ত সক্ষমতার কারণেই সরকারকে বিপুল পরিমাণ ক্যাপাসিটি চার্জ ও ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, অতীতের বিভিন্ন বিদ্যুৎ চুক্তির ত্রুটিগুলো এখন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সংশোধনের চেষ্টা চলছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি ক্ষেত্রে ট্যারিফ পুনর্নির্ধারণও করা হয়েছে।

বিশেষ ক্ষমতা আইনের অধীনে সম্পাদিত চুক্তিগুলো বাতিল হবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মিরানা মাহরুখ বলেন, আইনটি বাতিল হলেও এর আওতায় পূর্বে সম্পাদিত চুক্তিগুলো বহাল থাকবে। তবে ভবিষ্যতে ওই আইনের অধীনে নতুন কোনো চুক্তি করা হবে না।

তিনি বলেন, বড় কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি হঠাৎ বাতিল করা হলে এক থেকে দুই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিড থেকে বাদ পড়তে পারে। সেই সক্ষমতা পুনর্গঠনে চার থেকে পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে, যা শিল্প ও সাধারণ গ্রাহকদের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে।

বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পরও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত না হওয়ার বিষয়ে বিপিডিবির চেয়ারম্যান রেজাউল করিম বলেন, জুন মাসের বাড়তি বিলের অর্থ জুলাইয়ে আদায় হবে এবং এর বাস্তব প্রভাব আগস্ট থেকে পাওয়া যাবে। বেশি রাজস্ব আদায় হলে জ্বালানি সংগ্রহ সহজ হবে এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে।

তিনি জানান, পিডিবিকে শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিলই নয়, আরও নানা আর্থিক দায় পরিশোধ করতে হয়। ফলে অতিরিক্ত অর্থ সংগ্রহের আগে কাঙ্ক্ষিত উন্নতি সম্ভব হচ্ছে না।

বৃষ্টির কারণে দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা ১৩ হাজার মেগাওয়াটে নেমে এলেও লোডশেডিং অব্যাহত থাকার বিষয়ে বিপিডিবি চেয়ারম্যান বলেন, উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও অনেক এলাকায় গ্রিডের সীমাবদ্ধতার কারণে বিদ্যুৎ পৌঁছানো যাচ্ছে না। এসব এলাকায় তরল জ্বালানিভিত্তিক ইঞ্জিনচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা টানা ২৪ ঘণ্টা চালানো সম্ভব নয়।

গ্রামাঞ্চলে তুলনামূলক বেশি লোডশেডিংয়ের অভিযোগ প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকার শহর ও গ্রামের মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহে কোনো বৈষম্য চায় না। তবে ঢাকার বাস্তবতা আলাদা। সম্প্রতি দুটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রে কারিগরি ত্রুটির কারণে পরিস্থিতির অবনতি হয়েছিল। পরে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ায় ৩৬ ঘণ্টার মধ্যেই পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়।

প্রিপেইড মিটারে ১৫০ থেকে ২০০ ডিজিটের দীর্ঘ রিচার্জ টোকেনের বিষয়ে সচিব মিরানা মাহরুখ বলেন, ট্যারিফ পরিবর্তনের কারণে প্রযুক্তিগত সমন্বয় করতে গিয়ে এ সমস্যা তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যতে যাতে এমন পরিস্থিতি না হয়, সে জন্য মিটার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে।

জুন মাসের বিদ্যুৎ বিল নিয়ে অভিযোগ প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, অনেক গ্রাহক মে মাসের বিলের সঙ্গে জুন মাসের বিল তুলনা করেছেন। কিন্তু আগের বছরের একই সময়ের সঙ্গে তুলনা করলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক বিল পাওয়া যায়নি।

তিনি বলেন, নতুন ভাড়াটিয়া ওঠা, নতুন এসি বা ফ্রিজ ব্যবহার, অটোরিকশা চার্জ দেওয়া, নতুন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান চালু হওয়া এবং ঈদ উপলক্ষে বাসায় মানুষের উপস্থিতি বাড়ার মতো কারণেও বিদ্যুতের ব্যবহার বেড়ে থাকতে পারে।

এদিকে কাশিমপুরে এক গ্রাহকের ১ লাখ ২৪ হাজার টাকার বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগের বিষয়ে বিআরইবি চেয়ারম্যান এস এম জিয়া-উল-আজিম বলেন, তদন্তে দেখা গেছে সংযোগটি বকেয়া বিলের কারণে বিচ্ছিন্ন ছিল। পুনঃসংযোগের সময় আগের বকেয়া একসঙ্গে যুক্ত হওয়ায় বিলের পরিমাণ এত বেশি দেখা গেছে।