২০২৭ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা আগামী বছরের ৭ জানুয়ারি শুরু হবে এবং চলবে ৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। ব্যবহারিক পরীক্ষা শেষ হবে ১১ ফেব্রুয়ারির মধ্যে। অন্যদিকে ২০২৭ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা শুরু হবে ৬ জুন, চলবে ১৩ জুলাই পর্যন্ত এবং ব্যবহারিক পরীক্ষা শেষ হবে ১৮ জুলাইয়ের মধ্যে। শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনের সময় কমিয়ে আনা, সেশনজট নিরসন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ফল’ সেমিস্টারে ভর্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই নতুন এ সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
বৃহস্পতিবার বিকালে সচিবালয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক ব্রিফিং ও সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী আগামী বছরের গুরুত্বপূর্ণ এ দুই পাবলিক পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করেন। পরে শিক্ষা বোর্ডগুলোর পক্ষ থেকে পরীক্ষার প্রস্তাবিত সূচিও সাংবাদিকদের দেওয়া হয়।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, বর্তমানে এসএসসি এবং এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় প্রায় ৪০ লাখ পরীক্ষার্থী অংশ নেয়। স্বাভাবিকভাবে একজন শিক্ষার্থীর ১৬ বছর বয়সে এসএসসি এবং ১৮ বছর বয়সে এইচএসসি পাস করার কথা থাকলেও বাস্তবে দেখা যাচ্ছে শিক্ষার্থীরা প্রায় ২০ বছর বয়সে এইচএসসি পাস করছে।
তিনি বলেন, “গড়ে ২০ লাখ পরীক্ষার্থী পাবলিক পরীক্ষা দিলে এর ফলে ডেমগ্রাফিক ডেভিডেন্টে জাতি ৪০ লাখ বছর পিছিয়ে যাচ্ছে। সে ক্ষেত্রে আমরা চেষ্টা করছি সেশনজট কমিয়ে আনা, সিলেবাস কভার করা এবং সঠিকভাবে তাদের শিখন হওয়ার পরে পরীক্ষা নেওয়া এই বিষয়গুলোকে আমরা গুরুত্ব দিয়েছি।”
মন্ত্রী আরও বলেন, “এসএসসি পরীক্ষার জন্য বসে থাকে ছাত্রছাত্রীরা, প্রায় এক বছর নষ্ট হয়ে যায় এবং এইচএসসি পরীক্ষার জন্য ছাত্র-ছাত্রী বসে থেকে প্রায় এক বছর নষ্ট হয়ে যায়। এই গ্যাপটাকে ক্রমান্বয়ে আমরা ক্লোজ করতে চাচ্ছি।”
তিনি জানান, শিক্ষার্থীদের জীবনের দুই বছর যাতে নষ্ট না হয়, সে লক্ষ্যেই সরকার এগোচ্ছে। “আমরা ক্রমান্বয়ে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জীবন থেকে দুই বছর যেন নষ্ট না হয় সেই দিকে এগোচ্ছি। এটা তো আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এটাতো বোর্ড নিতে পারে না, মন্ত্রণালয় নেবে।”
এর আগে শিক্ষামন্ত্রী বলেছিলেন, তিনি স্কুল ও কলেজের সমাপনী পরীক্ষা ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করতে চান। তবে তার এ পরিকল্পনা নিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। পরে গত বুধবার মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সভায় শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবকসহ অংশীজনরা ২০২৭ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা জানুয়ারি মাসে এবং এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা জুন মাসে আয়োজনের প্রস্তাব দেন।
অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে আগামী বছরের পরীক্ষার সম্ভাব্য সূচি নির্ধারণ করা হলেও শিক্ষামন্ত্রী স্পষ্ট করেন যে, পর্যায়ক্রমে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা ডিসেম্বর মাসে নিয়ে আসার পরিকল্পনা থেকে সরকার সরে আসেনি।
তিনি বলেন, “আমরা লক্ষ্য নির্ধারণ করেছি যে ডিসেম্বর হলো পরীক্ষার জন্য আদর্শ মাস। এটা এসএসসি ও এইচএসসির। সেটাকে সামনে রেখে আমরা কাজ শুরু করেছি।”
শিক্ষামন্ত্রী জানান, পবিত্র রমজানের কারণে এসএসসি পরীক্ষা আগে শেষ করা হচ্ছে। “আগামী বছরের এসএসসি পরীক্ষা ৭ জানুয়ারি শুরু হয়ে ৬ ফেব্রুয়ারি শেষ হবে। আর এইচএসসি শুরু করা হবে ৬ জুন এবং শেষ করা হবে ১৩ জুলাই।”
তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ফল’ সেমিস্টারে যাতে শিক্ষার্থীরা ভর্তি হতে পারে, সে বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
“জুন মাসে পরীক্ষা নিচ্ছি, জুলাইতে শেষ হবে এবং তারা ফল সেমিস্টার ধরতে পারবে।”
ফল প্রকাশের বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, এসএসসি ও এইচএসসির তত্ত্বীয় পরীক্ষা শেষ হওয়ার দুই মাসের মধ্যে ফল প্রকাশ করা হবে।
তিনি বলেন, “দুই মাসের বেশি একদিনও কেউ রেজাল্ট ধরে রাখতে পারবে না, সেটাই প্র্যাকটিস হচ্ছে। তবে এখন যেহেতু আরো অ্যাডভান্স হয়েছে, এটাকে আরো স্কুইজ করা হবে।”
আগামী বছরের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের হাতে বিনামূল্যের পাঠ্যবই তুলে দেওয়ার আশাও প্রকাশ করেন শিক্ষামন্ত্রী।
তিনি বলেন, “এটা তো বিএনপি সরকার প্র্যাকটিস করে আসছে। ২০০২ সালের জানুয়ারি মাসের এক তারিখে আমরা বই দিয়েছিলাম, ২০০৬ সাল পর্যন্ত দিয়ে এসেছি। অতএব এটা তো আমরা প্র্যাকটিস আগেই করে ফেলছি। সেটা নিয়ে তো আর আমার নতুন প্র্যাকটিস করতে হবে না। এটা ডান। এক তারিখে বই আসবে এটা তো জানি। ইনশাল্লাহ।”
সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী জানান, সরকার পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নের সুযোগ চালু করতে আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে।
তিনি বলেন, “আমরা আইন পরিবর্তন করে পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নের ব্যবস্থা করছি। আগামী সংসদ অধিবেশনে আইনের সংশোধনী পাস হতে পারে।”
বর্তমানে পরীক্ষার খাতা পুনর্নিরীক্ষণের সুযোগ থাকলেও উত্তরপত্র মূল্যায়নের সুযোগ নেই। পুনর্নিরীক্ষণের ক্ষেত্রে মূলত নম্বর যোগ-বিয়োগে ভুল বা গুরুতর কোনো ত্রুটি আছে কি না, তা দেখা হয়।
দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত এসএসসি ও এইচএসসিতে প্রতিবছর লাখ লাখ শিক্ষার্থী অংশ নেয়। দীর্ঘদিন ধরে এসএসসি পরীক্ষা ফেব্রুয়ারির শুরুতে এবং এইচএসসি পরীক্ষা এপ্রিলের শুরুতে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছিল। তবে করোনা পরিস্থিতির পর থেকে সেই সূচি আর বজায় রাখা সম্ভব হয়নি। বরং পরীক্ষা আরও পিছিয়ে যায়। চলতি বছর ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষা শুরু হয়েছে ২১ এপ্রিল এবং এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হবে জুলাই মাসে।
সম্প্রতি ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে আয়োজনের লক্ষ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক মতবিনিময় সভায় ডিসেম্বরের মধ্যে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা আয়োজনের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়। তবে এ পরিকল্পনা প্রকাশের পর শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও অংশীজনদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। পরে গতকালের আনুষ্ঠানিক সভাতেও ২০২৭ সালে ডিসেম্বরে পরীক্ষা না নেওয়ার পক্ষে মত আসে। যদিও পর্যায়ক্রমে ভবিষ্যতে ডিসেম্বর মাসে পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়ে সম্মতি প্রকাশ করেন অংশীজনরা।
