- ‘কার্ড’ ও পুনর্বাসনের আশায় ফিরছেন হকাররা, বদলে যাচ্ছে পুরোনো বাস্তবতা
আয়েশা জান্নাত
রাজধানীর গুলিস্তানে ১ মে হকার উচ্ছেদ অভিযানের পর কয়েকদিনের জন্য ফুটপাত ফাঁকা দেখা গেলেও সেই পরিস্থিতি বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে আবারও ফুটপাতজুড়ে বসতে শুরু করেছেন হকাররা। জামাকাপড়, জুতা, ব্যাগ, খেলনা থেকে শুরু করে ছোটখাটো গৃহস্থালি পণ্য—সবকিছু নিয়েই আগের মতো সরগরম হয়ে উঠেছে গুলিস্তান এলাকা। তবে এবার হকারদের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি ঘুরছে একটি শব্দ—“কার্ড”।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) ডিজিটাল পরিচয়পত্র ও পুনর্বাসন পরিকল্পনাকে ঘিরে নতুন করে আশাবাদ তৈরি হয়েছে ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের মধ্যে। কেউ বলছেন ‘পারমিশন’ পেয়েছেন, কেউ বলছেন তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে, আবার কেউ অপেক্ষা করছেন ডিজিটাল আইডি কার্ড হাতে পাওয়ার।
গুলিস্তানের ফুটপাতে কথা হয় মুন্সীগঞ্জের বাসিন্দা প্রিন্সের সঙ্গে। প্রতিদিন ভোরে মুন্সীগঞ্জ থেকে ঢাকায় এসে ফুটপাতে ব্যবসা করেন তিনি। একই সঙ্গে কলেজে পড়াশোনাও চালিয়ে যাচ্ছেন। তার ভাষ্য, “এক তারিখে উচ্ছেদের পর বসি নাই। পরে দেখি সবাই আবার বসতেছে, তাই আমিও বসছি।”
প্রিন্স জানান, বর্তমানে তিনি তার অসুস্থ মামার দোকান সামলাচ্ছেন। “এটা আমার মামার দোকান। মামা অসুস্থ, তাই আমি চালাই। সকালে আসি, দোকান খুলি, রাত হলে আবার মুন্সীগঞ্জে চলে যাই। কলেজ থাকলে ক্লাসও করি,” বলেন তিনি।
ফুটপাতে বসতে কোনো টাকা দিতে হয় কি না—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “পাঁচ তারিখের পর কাউরে টাকা দেই নাই। আগে কিছু নেতা প্রতিদিন ভাড়া নিতো।” তবে কারা টাকা নিতেন, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট করে কিছু বলতে চাননি তিনি।
গুলিস্তানে কথা হয় আরেক হকার সবুজের সঙ্গে। তিনি দাবি করেন, সিটি কর্পোরেশন থেকেই তাদের বসার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। “আমাদের সিটি কর্পোরেশন পারমিশন দিছে। একটা কার্ডও দিছে। ওই কার্ড দিয়া আমরা বসতেছি,” বলেন তিনি।
তবে কার্ড দেখাতে বললে সবুজ জানান, কার্ডটি তার সঙ্গে নেই। একই ধরনের কথা বলেন পাশেই থাকা আরেক প্রবীণ হকারও। তার ভাষ্য, “কার্ড বাসায় রেখে আসছি।”
গুলিস্তানের ফুটপাতে জুতা বিক্রি করছিলেন ফয়সাল। রাস্তার ওপর প্লাস্টিকের জুতা সাজিয়ে বসে ক্রেতাদের ডাকছিলেন তিনি। মাঝে মাঝে কেউ থেমে দেখছেন, কেউ কিনছেন, আবার অনেকে চলে যাচ্ছেন। ফয়সাল বলেন, “এক তারিখে উঠাইয়া দিছে। পরে আবার সবাই বসছে, আমরাও বসছি।”
তিনি জানান, সিটি কর্পোরেশন তাদের আইডি কার্ড, ছবি, জন্মনিবন্ধনসহ বিভিন্ন তথ্য জমা নিয়েছে। “শুনছি আমাদেরও কার্ড দিবো। যতদিন কার্ড না দেয়, ততদিন এখানে বসতে বলছে,” বলেন তিনি।
সংসারের চাপের কথা বলতে গিয়ে কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন ফয়সাল। “পেট তো চালাইতে হইবো। অন্য কোনো ইনকাম নাই। পরিবার এই টাকার ওপরই চলে,” বলেন তিনি।
পুনর্বাসন প্রসঙ্গে ফয়সাল জানান, বাইতুল মোকাররম এলাকার দিকে নির্দিষ্ট স্থান চিহ্নিত করার কাজ চলছে। “শুনছি দাগ দিতেছে। পরে নিয়ম কইরা বসাইবো। তখন হয়তো নির্দিষ্ট জায়গা পাইমু,” বলেন তিনি।
একই ধরনের প্রত্যাশার কথা জানান হকার ইয়াসিন। তিনি বলেন, “শুনছি আমাদের জায়গা দিবো। বাইতুল মোকাররমে দাগ দিতেছে, পরে এইদিকেও দিবো। তখন নিয়ম কইরা বসতে পারমু।”
হকারদের দীর্ঘদিনের দাবির প্রসঙ্গ টেনে ইয়াসিন বলেন, “আমরা তো হালাল ব্যবসা করি। নিজের টাকা লগাইয়া মাল কিনি। একটা জামায় দশ-বিশ টাকা লাভ হয়। দোকান ভাড়া নিতে গেলে লাখ লাখ টাকা লাগে, সেই সামর্থ্য আমাদের নাই।”
তিনি আরও বলেন, “এখন ১০০ জনরে কার্ড দিছে। বাকিদের নামও নিচ্ছে। তালিকা অনুসারে ডাকতেছে।”
রাজধানীতে হকারের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নিয়ে নির্ভরযোগ্য সরকারি তথ্য না থাকলেও বিভিন্ন সংগঠনের হিসাবে সংখ্যাটি কয়েক লাখ। বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়নের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় প্রায় ৪ লাখ হকার রয়েছেন। অন্যদিকে বাংলাদেশ ছিন্নমূল হকার সমিতির হিসাবে বর্তমানে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার হকার কর্মরত।
বিভিন্ন সংস্থার তথ্যমতে, ঢাকা মহানগরীর প্রায় ৩৮৮ কিলোমিটার ফুটপাথের মধ্যে প্রায় ১৫৫ কিলোমিটার কোনো না কোনোভাবে হকারদের দখলে থাকে। দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে, ফুটপাতে বসতে অনেককেই দৈনিক বা মাসিক ভিত্তিতে চাঁদা দিতে হয়। যদিও প্রকাশ্যে কেউ নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নাম বলতে রাজি হন না।
এই বাস্তবতায় সম্প্রতি হকারদের তালিকাভুক্তকরণ ও ডিজিটাল পরিচয়পত্র দেওয়ার উদ্যোগ নেয় ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন। চলতি বছরে গুলিস্তান এলাকায় ১০০ জন হকারকে রমনা ভবন সংলগ্ন লিংক রোড এলাকায় পুনর্বাসনের জন্য কিউআর কোড সম্বলিত ডিজিটাল পরিচয়পত্র দেওয়া হয়েছে। এছাড়া উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন মিলিয়ে ইতোমধ্যে ৩০২ জন হকারকে ডিজিটাল আইডি কার্ড দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
ডিএসসিসির প্রস্তাবিত নীতিমালার আওতায় রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় নির্দিষ্ট সময় ও স্থানে হকার বসার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গুলিস্তানের রমনা ভবন লিংক রোড, মতিঝিল এজিবি কলোনি মাঠ এলাকা, ইসলাম চেম্বারের সামনে, রাজউক ভবনের পেছন অংশ, টুইন টাওয়ার গলি, বাইতুল মোকাররম পূর্ব গেইট সংলগ্ন এলাকা, নিউ মার্কেট দক্ষিণ গেট এবং শাজাহানপুর রেলওয়ে কলোনির কিছু অংশ।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, “আমরা ১০০ জন হকারকে কিউআর কোড সম্বলিত ডিজিটাল পরিচয়পত্র দিয়েছি। পর্যায়ক্রমে নীতিমালা অনুযায়ী অন্যদেরও দেওয়া হবে। এতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে।”
তিনি আরও বলেন, “ট্রাফিক পুলিশ সহজেই তাদের বৈধতা ও নির্ধারিত স্থান যাচাই করতে পারবে। একই সঙ্গে পথচারীদের চলাচলের জন্য অন্তত পাঁচ থেকে ছয় ফুট জায়গা খালি রাখার বাধ্যবাধকতাও থাকবে।”
গুলিস্তানের ফুটপাতের বর্তমান পরিস্থিতি যেন নতুন এক বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। উচ্ছেদ, পুনর্বাসন, ডিজিটাল কার্ড এবং নিয়ন্ত্রিত ফুটপাত ব্যবস্থাপনা—সব মিলিয়ে হকারদের জীবনে অনিশ্চয়তার পাশাপাশি তৈরি হয়েছে টিকে থাকার নতুন প্রত্যাশাও।
