টানা বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও বন্যার কারণে চলমান এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় কোনো শিক্ষার্থী অংশ নিতে না পারলে জরিপ ও পর্যালোচনার ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রে পুনঃপরীক্ষার ব্যবস্থা করা হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। একই সঙ্গে পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রের প্রশ্নপত্রে থাকা দুটি ভুল প্রশ্নের জন্য সব পরীক্ষার্থীকে পূর্ণ নম্বর দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথাও জানিয়েছেন তিনি। এদিকে শিক্ষামন্ত্রীর নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি আলোচিত বক্তব্যকে সম্পূর্ণ ভুয়া বলে শনাক্ত করেছে প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের (পিআইবি) ফ্যাক্টচেক ও মিডিয়া রিসার্চ টিম ‘বাংলাফ্যাক্ট’।
মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে বিভিন্ন সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী চলমান পরীক্ষা, দুর্যোগ পরিস্থিতি, শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি, প্রশ্নপত্রের ভুল এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভ্রান্তিকর তথ্য নিয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন।
পুনঃপরীক্ষার আশ্বাস
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, সরকার চায় না প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জলাবদ্ধতা কিংবা প্রশাসনিক কোনো সীমাবদ্ধতার কারণে একজন পরীক্ষার্থীও ক্ষতিগ্রস্ত হোক। কোনো কেন্দ্রে যদি এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় যে পরীক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিতে পারেনি, তাহলে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের তথ্য সংগ্রহ, জরিপ ও যাচাই-বাছাইয়ের পর প্রয়োজন হলে সেখানে পুনরায় পরীক্ষা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, বিভিন্ন এলাকায় দুর্যোগের কারণে পরীক্ষা স্থগিত করার অভিজ্ঞতা সরকারের রয়েছে। বিকল্প প্রশ্নপত্রও প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ফলে প্রয়োজনে পুনঃপরীক্ষা আয়োজন করা কঠিন কোনো বিষয় নয়।
মন্ত্রী জানান, ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীনে বন্যাকবলিত এলাকার কয়েকটি পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। ভবিষ্যতেও প্রয়োজন দেখা দিলে একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ও মন্ত্রীর আহ্বান
দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যে পরীক্ষা নেওয়া, বিভিন্ন কেন্দ্রে জলাবদ্ধতা এবং পদার্থবিজ্ঞানের প্রশ্নপত্রে ভুল থাকার অভিযোগকে কেন্দ্র করে মঙ্গলবার রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করেন। অনেক স্থানে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিও ওঠে।
এ প্রসঙ্গে সংসদে শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষার্থীদের শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, সরকার তাদের চেয়েও বেশি উদ্বিগ্ন যে কীভাবে নিরাপদ ও সুষ্ঠুভাবে পরীক্ষা সম্পন্ন করা যায়।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ফিরে যাওয়া উচিত। যেসব কেন্দ্রে বাস্তবিক সমস্যা হয়েছে, সেসব বিষয়ে সরকার দায়িত্বশীলভাবে সিদ্ধান্ত নেবে। কোনো শিক্ষার্থীকে অন্যায়ের শিকার হতে দেওয়া হবে না।
কেন্দ্র পরিবর্তনের নির্দেশ ছিল
শিক্ষামন্ত্রী জানান, বর্ষা মৌসুম শুরুর পর থেকেই শিক্ষা মন্ত্রণালয় সারাদেশের পরীক্ষাকেন্দ্র নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করেছে। দেশের ৬৪ জেলার জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, বিভাগীয় কমিশনার এবং সব শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হয়।
তিনি বলেন, কোনো পরীক্ষাকেন্দ্রে পানি ঢুকলে স্থানীয় প্রশাসনকে তাৎক্ষণিকভাবে বিকল্প কেন্দ্রে পরীক্ষা স্থানান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ায় পরীক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিতে পেরেছেন।
মন্ত্রী জানান, কুমিল্লার একটি কেন্দ্র ছাড়া অন্য কোথাও বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়নি। যেসব কেন্দ্রে পানি উঠেছিল, সেগুলোর মধ্যে কয়েকটিতে দ্রুত কেন্দ্র পরিবর্তন করে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে।
কুমিল্লার কেন্দ্র নিয়ে যা বললেন
কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রের ঘটনা দেশজুড়ে আলোচনার সৃষ্টি করে। ওই কেন্দ্রে জলাবদ্ধতার কারণে পরীক্ষার্থীদের নৌকায় করে বিকল্প ভবনে নিয়ে পরীক্ষা নেওয়া হয়।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, কেন্দ্রটি প্লাবিত হওয়ার খবর পাওয়ার পরপরই স্থানীয় সরকার, জেলা প্রশাসন, পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। পরে পরীক্ষার্থীদের একটি পাঁচতলা ভবনে স্থানান্তর করে পরীক্ষা নেওয়া হয়।
তিনি আরও জানান, সেখানে পরীক্ষা বিলম্বে শুরু করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। একজন পরীক্ষার্থীর পোশাক ভিজে যাওয়ায় তার জন্য বাড়ি থেকে পোশাক এনে দেওয়া হয় এবং তাকে অতিরিক্ত সময় দিয়ে পরীক্ষা সম্পন্ন করার সুযোগ দেওয়া হয়।
কেন পরীক্ষা স্থগিত করা হয়নি
সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, পরীক্ষা শুরুর আগে আবহাওয়া পরিস্থিতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছিল। আবহাওয়া অধিদপ্তর থেকে জানানো হয়েছিল যে পরিস্থিতির উন্নতি হবে এবং অতিরিক্ত বৃষ্টির সম্ভাবনা কম।
তিনি জানান, বিকেল পর্যন্ত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে পরীক্ষা নির্ধারিত সময়েই নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। তবে যেসব এলাকায় পরে পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে, সেখানে স্থানীয় প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়।
চট্টগ্রাম বোর্ডে আলাদা ব্যবস্থা
মন্ত্রী বলেন, বন্যা পরিস্থিতির কারণে প্রথমে রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি জেলার পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। পরে পরিস্থিতির অবনতির কারণে পুরো চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের কয়েক দিনের পরীক্ষাও স্থগিত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের স্বার্থ বিবেচনায় প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে সরকার কখনোই পিছপা হবে না।
পদার্থবিজ্ঞানের প্রশ্নে ভুল
চলতি এইচএসসি পরীক্ষার পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রের ৬ ও ৭ নম্বর প্রশ্নে ভুল থাকার বিষয়টি স্বীকার করেন শিক্ষামন্ত্রী।
তিনি জানান, ভুল শনাক্ত হওয়ার পরই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে ওই দুটি প্রশ্নের জন্য সব পরীক্ষার্থী পূর্ণ নম্বর পাবে। ফলে কোনো শিক্ষার্থী প্রশ্নের ভুলের কারণে নম্বর হারাবে না।
মন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার আগেই প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও মডারেশনের কাজ সম্পন্ন হয়েছিল। সেই কারণে নতুন করে প্রশ্ন পরিবর্তনের সুযোগ ছিল না। আগের দায়িত্বপ্রাপ্ত মডারেটরদের প্রস্তুত করা প্রশ্নপত্রেই এই ভুল ছিল।
শিক্ষার্থীদের ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, সরকার মনে করে শিক্ষার্থীরা দেশের ভবিষ্যৎ। তাই দুর্যোগ, প্রশাসনিক ত্রুটি কিংবা প্রশ্নপত্রের ভুলের কারণে তাদের শিক্ষাজীবনে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়তে দেওয়া হবে না।
তিনি বলেন, কোথাও যদি তদন্তে দেখা যায় প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে পরীক্ষার্থীরা বঞ্চিত হয়েছে, তাহলে সেই তথ্যের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুনঃপরীক্ষাও তার অংশ হতে পারে।
পরীক্ষা এগিয়ে আনার পরিকল্পনা
বর্ষা মৌসুমে প্রতিবছর পরীক্ষার্থীদের দুর্ভোগের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ভবিষ্যতে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার সময়সূচিতে পরিবর্তনের পরিকল্পনার কথাও জানান শিক্ষামন্ত্রী।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পরীক্ষার সময় কিছুটা এগিয়ে আনা হয়েছে। ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থীদের ভিত্তি ধরে পর্যায়ক্রমে পরীক্ষা ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে নেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। এতে বর্ষাকালে পরীক্ষা আয়োজনের প্রয়োজন অনেকটাই কমে আসবে।
সরকারের অবস্থান
শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, সরকার শিক্ষার্থীদের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। দুর্যোগ মোকাবিলার পাশাপাশি সুষ্ঠুভাবে পরীক্ষা সম্পন্ন করাই এখন সবচেয়ে বড় লক্ষ্য।
তিনি বলেন, কোনো শিক্ষার্থী যাতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, প্রশ্নপত্রের ভুল কিংবা প্রশাসনিক ত্রুটির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে পুনঃপরীক্ষা, বিকল্প প্রশ্নপত্র কিংবা অন্য যে সিদ্ধান্ত প্রয়োজন হবে, সরকার তা নিতে প্রস্তুত।
তিনি আরও বলেন, শিক্ষার্থীরা দেশের ভবিষ্যৎ সম্পদ। তাদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব এবং সেই দায়িত্ব পালনে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
