- ঢাকায় ২৭ ঘণ্টায় ১১০ মিলিমিটার বৃষ্টি, তীব্রতা কমবে মঙ্গলবার থেকে; তবু আভাস আরও বৃষ্টির
রাজধানীতে রোববার সকাল থেকে সোমবার সকাল পর্যন্ত ২৭ ঘণ্টায় ১১০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। টানা এই বর্ষণে তলিয়ে যায় রাজধানীর অধিকাংশ সড়ক, কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে নগরীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। তবে স্বস্তির খবর দিয়েছে আবহাওয়া অফিস—মঙ্গলবার থেকে বৃষ্টিপাতের তীব্রতা কমতে পারে। তবে আগামী বৃহস্পতিবার থেকে মৌসুমি বায়ু পুনরায় সক্রিয় হয়ে আবারও বাড়তে পারে বৃষ্টির প্রকোপ।
বৃষ্টির পরিসংখ্যান ও পূর্বাভাস
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, রোববার সকাল ৬টা থেকে সোমবার সকাল ৯টা পর্যন্ত ২৭ ঘণ্টায় রাজধানীতে ১১০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। এর আগে রোববার সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ৮২ মিলিমিটার বৃষ্টি নথিবদ্ধ করেছিল আবহাওয়া অফিস।
আবহাওয়াবিদ মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, “১৫ জুলাই পর্যন্ত বৃষ্টিপাতের তীব্রতা কম থাকবে। তবে মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকার কারণে পুনরায় বৃষ্টিপাতের তীব্রতা বাড়তে পারে।”
ভারি বৃষ্টিপাতজনিত সতর্কবার্তায় আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, সক্রিয় মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে সোমবার দুপুর ১১টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও ভারি থেকে অতিভারি বর্ষণ হতে পারে। ভারি থেকে অতিভারি বর্ষণের কারণে ঢাকা মহানগরীর কোথাও কোথাও অস্থায়ীভাবে জলাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।
আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক আরও জানান, আগামীকাল মঙ্গলবার থেকে খুলনা বিভাগে বৃষ্টির তীব্রতা কমে যেতে পারে, সিলেটেও কমবে। ঢাকা বিভাগের মাদারীপুর, ফরিদপুরসহ বিভিন্ন জেলা এবং বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগেও বৃষ্টির তীব্রতা কমতে পারে। তবে বৃষ্টি একেবারে চলে যাবে না—এক-দুই পশলা বৃষ্টি হতেই থাকবে। রাজধানীতে আগামীকাল সামান্য সময়ের জন্য রোদের মুখও দেখা যেতে পারে। এ অবস্থা চলতে পারে আগামী শুক্রবার পর্যন্ত, তবে এরপর আবার বৃষ্টি বেশি হতে পারে।
সোমবারও দুর্ভোগ, দুপুরে রোদের দেখা
অতি ভারি বৃষ্টি আর তাতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় সোমবারও দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে রাজধানীবাসীকে। সকালে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় অফিস ও শিক্ষালয়মুখীরা ভোগান্তিতে পড়েন। গণপরিবহনের সংখ্যা ছিল তুলনামূলক কম, ছাতা মাথায় বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিলেন চাকুরিজীবীরা। ব্যাটারিচালিত রিকশা এবং সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালকরা হাঁকাচ্ছিলেন কয়েকগুণ বেশি ভাড়া।
দুপুরে রোদের দেখা মিললেও বিভিন্ন এলাকায় এখনো জমে ছিল পানি। কিছু এলাকায় পানি নেমে গেলেও সৃষ্টি হয়েছে খানাখন্দ। জলাবদ্ধতার কারণে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যান চলাচল করছে ধীরগতিতে।
নিউ মার্কেট এলাকায় দেখা গেছে, রোববারের সৃষ্ট জলাবদ্ধতা সোমবার সকালেও ছিল। নীলক্ষেত মোড় থেকে কুয়েত মৈত্রী হলের গেইট পর্যন্ত সড়ক তলিয়ে যায়। রাত ১০টার পর থেকে পানি নামতে শুরু করে। নীলক্ষেত মোড়ে গাড়ির অপেক্ষায় থাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী সায়েদুল হক নিশান বলেন, “অন্য সময়ে ৩ থেকে ৪ ঘণ্টার মধ্যে সড়কের পানি নেমে যায়। এবার ২৪ ঘণ্টা পার হলেও পানি জমে আছে।”
গুলশান ট্রাফিক বিভাগ জানায়, বনানী কবরস্থানের পর ঢাকা গেট সংলগ্ন মূল সড়কের ইনকামিং ও আউটগোয়িং উভয় লেনে পানি জমে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। বনানী-কাকলী এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের র্যাম্পের নামার অংশেও হালকা জলাবদ্ধতার কারণে যানবাহন ধীরগতিতে চলাচল করছে। ইসিবি এলাকায় ক্যান্টনমেন্ট গার্লস স্কুলের সামনে পানি জমে থাকায় মিরপুর ডিওএইচএস ও কালশী থেকে ইসিবি হয়ে মাটিকাটা ফ্লাইওভারের দিকে চলাচলকারী যানবাহনের গতি কমে গেছে।
ট্রাফিক পুলিশ বলছে, বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে উল্লিখিত সড়কগুলোতে জলাবদ্ধতার কারণে যানজট আরও বাড়তে পারে। এ কারণে বিকল্প সড়ক ব্যবহার এবং গন্তব্যে পৌঁছাতে পর্যাপ্ত সময় হাতে নিয়ে বের হতে নগরবাসীর প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে।
নদীবন্দরে সতর্ক সংকেত
ঝড়ো হাওয়া বয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকায় দেশের বেশ কিছু নদীবন্দরে ১ নম্বর সতর্কতা সংকেত বহাল রেখেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। সোমবার সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরীণ নদীবন্দরগুলোর জন্য দেওয়া সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, রংপুর, দিনাজপুর, রাজশাহী, পাবনা, বগুড়া, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, ঢাকা, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালী, কুমিল্লা, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এবং সিলেট অঞ্চলের উপর দিয়ে দক্ষিণ বা দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে ঘন্টায় ৪৫ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেগে অস্থায়ীভাবে দমকা বা ঝড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি বা বজ্রবৃষ্টি হতে পারে।
আবহাওয়ার সামগ্রিক চিত্র
আবহাওয়া অধিদপ্তরের নিয়মিত বুলেটিনে বলা হয়েছে, মৌসুমি বায়ুর বর্ধিতাংশের অক্ষ ভারতের পাঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তর প্রদেশ, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের মধ্যাঞ্চল হয়ে আসাম পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। এর একটি বর্ধিতাংশ উত্তর বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের উপর সক্রিয় এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে মাঝারি অবস্থায় বিরাজমান আছে।
সোমবার সকাল ৬টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল নীলফামারীর সৈয়দপুরে ৩৫ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল বান্দরবানে ২২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই সময়ে সারাদেশে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত হয়েছে চট্টগ্রামের আমবাগানে ১৭৪ মিলিমিটার। এছাড়া চট্টগ্রামে ১৬৩ মিলিমিটার, সন্দীপে ১৪৮, বান্দরবানে ১১৫, ফরিদপুরে ১০৪ এবং সীতাকুণ্ডে ৯৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত নথিবদ্ধ করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
বারবার ডুবে যাওয়া এক শহরের করুণ চিত্র
বর্ষার বৃষ্টি বাংলার চিরন্তন সৌন্দর্যের প্রতীক। এই বৃষ্টি কৃষকের মাঠে নতুন জীবনের স্বপ্ন বুনে, নদী-খালে ফিরিয়ে আনে প্রাণের স্রোত। কিন্তু সেই একই বৃষ্টি যখন রাজধানী ঢাকার রাজপথকে নদীতে পরিণত করে, মানুষের কর্মচাঞ্চল্য থামিয়ে দেয় এবং একটি আধুনিক মহানগরকে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে অচল করে ফেলে, তখন প্রশ্ন জাগে—আমাদের উন্নয়ন কি সত্যিই ভারসাম্যপূর্ণ, নাকি আমরা আকাশ ছুঁতে গিয়ে মাটির বাস্তবতাকে ভুলে গেছি?
জলাবদ্ধতার চিত্র
রোববারের টানা অতি ভারী বর্ষণ যেন একযোগে পুরো রাজধানীকে এক মহাসংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৭ ঘণ্টায় ঢাকায় রেকর্ড ১১০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। এই তুমুল বর্ষণে রাজধানীর মিরপুর, গুলশান, বনানী, ফকিরাপুল, আরামবাগ, মালিবাগ, মৌচাক, মগবাজার, গ্রিন রোড, কারওয়ান বাজার, ধানমণ্ডিসহ প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকার রাজপথ থেকে অলিগলি হাঁটু থেকে কোমরসমান পানিতে তলিয়ে গেছে। ফলে অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী ও পথচারীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা চরম ভোগান্তির শিকার হয়েছেন।
এই দুর্ভোগ যে কেবল পরিসংখ্যানের বিষয় নয়, তার বাস্তব চিত্র দেখা গেছে এলাকায় এলাকায়। অসুস্থ শিশুকে নিয়ে চিকিৎসকের কাছে আসা অভিভাবকদের মানসিক বিপর্যস্ত হওয়া, পরীক্ষা স্থগিত হওয়া শিক্ষার্থীদের হতাশা, আর পানিবন্দী হয়ে পড়া কর্মজীবীদের অসহায়তা—জলাবদ্ধতা কেবল রাস্তায় পানি জমার নাম নয়; এটি চিকিৎসা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, অর্থনীতি ও মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে একসঙ্গে বিপর্যস্ত করে দেওয়া একটি বহুমাত্রিক সংকট।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্থগিত পরীক্ষা
রাস্তায় জলাবদ্ধতার কারণে রাজধানীর কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চলমান অর্ধবার্ষিক ও অন্যান্য পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও পরীক্ষা বন্ধ করা হয়। সড়কে ক্ষয়ক্ষতি এবং খানাখন্দ তৈরি হয় অনেক জায়গায়। দিনভর জলাবদ্ধতার কারণে সীমাহীন ভোগান্তিতে পড়েন নগরবাসী।
নগর পরিকল্পনার ব্যর্থতা
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্বল্প সময়ে অতি ভারী বৃষ্টির প্রবণতা বেড়েছে—এটি বৈশ্বিক বাস্তবতা। কিন্তু সেই বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নগর পরিকল্পনা করা আমাদের দায়িত্ব ছিল। ঢাকাকে আমরা ক্রমান্বয়ে ‘কংক্রিটের জঙ্গলে’ পরিণত করেছি, যেখানে পানি শোষণের প্রাকৃতিক ব্যবস্থা অবশিষ্ট নেই। একসময় ঢাকার বুকজুড়ে ছিল অসংখ্য খাল, জলাভূমি ও উন্মুক্ত নিম্নাঞ্চল। আজ সেগুলোর অনেকগুলো দখল, ভরাট বা দূষণের শিকার।
২০১০ সালের পর ঢাকা হারিয়েছে ৩ হাজার ৪৪০ একর বন্যাপ্রবাহ অঞ্চল ও জলাশয়। কেন্দ্রীয় ঢাকায় জলাশয়ের পরিমাণ ১৯৯৫ সালে ছিল ২০.৫৭ শতাংশ, যা ২০২৩ সালে নেমে এসেছে মাত্র ২.৯ শতাংশে। গত চার বছরে দুই সিটি করপোরেশন নিষ্কাশনব্যবস্থার উন্নয়নে ২৬২ কোটি টাকা খরচ করলেও নিউমার্কেটের নিষ্কাশন পথ আজও বন্ধ। বিশেষজ্ঞদের মতে, মাত্র ১৫টি দখলকৃত খাল পুনরুদ্ধার করলে ঢাকার জলাবদ্ধতার ৮০ শতাংশ কমানো সম্ভব, অথচ সেই কাজ হয় না।
নাগরিকদেরও দায়িত্ব
এই কাঠামোগত ব্যর্থতার বাইরেও নাগরিকেরা কম দায়ী নন। প্রতিদিন যেখানেসেখানে ফেলে দেওয়া পলিথিন, প্লাস্টিকের বোতল, কাপ ও প্যাকেট বৃষ্টির পানির তোড়ে গিয়ে পড়ে ড্রেন, কালভার্ট ও স্যুয়ারেজ লাইনে। প্লাস্টিক সহজে পচে না বা গলে না। এ কারণে এগুলো নালার মুখে আটকে গেলে কোটি কোটি টাকার নিষ্কাশনব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে। নিজের ঘরের ময়লা ফেলতে গিয়ে আমরা ভুলে যাই, এই অসচেতনতাই পরে কয়েক লাখ মানুষের কোমরপানির নরকযন্ত্রণা তৈরি করে। নাগরিক দায়িত্ববোধ ছাড়া কোনো আধুনিক নগরব্যবস্থাই টেকসই হতে পারে না।
অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্যঝুঁকি
জলাবদ্ধতার অর্থনৈতিক ক্ষতিও ভয়াবহ। কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাহত হয়, দোকান ও গুদামে পানি ঢুকে কোটি টাকার পণ্য নষ্ট হয়। সড়কে পানি জমে থাকায় ওয়াসা, ডিপিডিসি ও তিতাসের অপরিকল্পিত রাস্তা খননের ফলে সৃষ্ট গর্ত ও ত্রুটিপূর্ণ বৈদ্যুতিক সংযোগ পানির নিচে ঢাকা পড়ে মরণফাঁদে পরিণত হয়। প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে এবং নোংরা পানি ঢুকে মাঝপথে বিকল হয়ে পড়ে শত শত যানবাহন।
একই সঙ্গে নোংরা পানি ডায়রিয়া, চর্মরোগ, টাইফয়েড, জন্ডিসসহ নানা পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ায় এবং এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র হয়ে ডেঙ্গু পরিস্থিতিকে প্রাণঘাতী করে তোলে।
প্রশাসনের পদক্ষেপ
এই ভয়াবহ পরিস্থিতি আমলে নিয়ে টানা অতিবৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষা এবং দ্রুত ত্রাণ ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মাঠ প্রশাসন, দুই সিটি করপোরেশন ও সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে কোনো গাফিলতি না করার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন কমলাপুর ও ধোলাইখালের পাম্প চালু রেখেছে এবং উত্তর সিটি করপোরেশন পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদারের কথা জানিয়েছে। কিন্তু এই সাময়িক ব্যবস্থা স্থায়ী সমাধান নয়। প্রতিবছর একই সংকট ফিরে আসা প্রমাণ করে, স্থায়ী সমাধান এখন সময়ের দাবি।
খাল পুনরুদ্ধার, জলাভূমি সংরক্ষণ, কার্যকর ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন, প্লাস্টিক বর্জ্য নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন ও নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি, নদীগুলোর নিয়মিত ড্রেজিং এবং নগর উন্নয়নে পরিবেশগত ভারসাম্য নিশ্চিত করা ছাড়া এই শহরকে জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে মুক্ত করা সম্ভব নয়।
উন্নয়ন কেবল উড়ালসড়ক, মেট্রোরেল কিংবা সুউচ্চ ভবনের সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। প্রকৃত উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন একজন শ্রমজীবী মানুষ বর্ষার দিনে নিরাপদে কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারেন, একজন শিক্ষার্থী সময়মতো বিদ্যালয়ে যেতে পারে, একজন রোগী বাধাহীনভাবে হাসপাতালে পৌঁছাতে পারেন এবং একটি শহর তার স্বাভাবিক ছন্দ বজায় রাখতে সক্ষম হয়।
প্রতিবছর বর্ষা এলেই যদি একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটে, তবে তা কেবল প্রকৃতির দায় নয়; এটি আমাদের পরিকল্পনা, সমন্বয়, ব্যবস্থাপনা এবং জবাবদিহির ঘাটতির প্রতিফলন। রাজধানীকে সত্যিকার অর্থে বাসযোগ্য করে তুলতে হলে উন্নয়নের সংজ্ঞাকে নতুন করে ভাবতে হবে। আকাশছোঁয়া স্থাপনার পাশাপাশি মাটির নিচের ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক, খাল, জলাশয়, উন্মুক্ত জলাধার এবং প্রাকৃতিক পরিবেশকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
ঢাকার জলাবদ্ধতা কোনো অনিবার্য নিয়তি নয়; এটি দীর্ঘদিনের পরিকল্পনাগত দুর্বলতা, পরিবেশগত অবহেলা এবং সমন্বয়ের অভাব থেকে সৃষ্ট একটি সংকট, যার সমাধানও মানুষের হাতেই। প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক নগর–পরিকল্পনা, কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনা, খাল ও জলাশয় পুনরুদ্ধার, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ এবং কঠোর জবাবদিহি। সেই সঙ্গে নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করতে হবে।
যেদিন উন্নয়ন কেবল দৃশ্যমান অবকাঠামো নয়; বরং মানুষের নিরাপত্তা, স্বস্তি ও জীবনমানের সঙ্গে সমানভাবে যুক্ত হবে, সেদিন বর্ষার বৃষ্টি আবারও বাংলার সৌন্দর্যের প্রতীক হয়ে উঠবে—নাগরিক দুর্ভোগের নয়। রাজধানী তখনই সত্যিকার অর্থে একটি সহনশীল, পরিকল্পিত ও বাসযোগ্য নগরীতে পরিণত হবে।
বর্ষার বৃষ্টি কখনো শত্রু নয়; শত্রু আমাদের অব্যবস্থাপনা, অবহেলা ও অসচেতনতা। প্রকৃতি তার নিয়মে বৃষ্টি বর্ষণ করবে, কিন্তু সেই বৃষ্টিকে আশীর্বাদ না অভিশাপে পরিণত করব—সেই সিদ্ধান্ত আমাদেরই। আমরা যদি খালকে ফিরিয়ে দিই তার প্রবাহ, নদীকে ফিরিয়ে দিই তার বিস্তার, ড্রেনকে রাখি বর্জ্যমুক্ত এবং নাগরিক দায়িত্বকে করি জীবনের অংশ, তবে বর্ষার জল আর দুর্ভোগের প্রতীক হবে না; হয়ে উঠবে জীবন, সবুজ আর সমৃদ্ধির প্রতীক।
