- স্বাস্থ্যসেবা সচল রাখতে জরুরি পদক্ষেপ; পর্যাপ্ত ওষুধ, স্যালাইন ও অ্যান্টিভেনম মজুত, এখনো মেলেনি কলেরা সংক্রমণের তথ্য
বন্যাকবলিত ১১ জেলায় স্বাস্থ্যসেবা নিরবচ্ছিন্ন রাখতে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সব ধরনের ছুটি বাতিল করেছে সরকার। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি উপজেলায় মেডিকেল টিম মোতায়েন করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় ওষুধ, খাবার স্যালাইন, অ্যান্টিভেনমসহ জরুরি চিকিৎসাসামগ্রী মাঠপর্যায়ে পাঠানো হচ্ছে। সরকারের দাবি, বন্যাকবলিত এলাকায় এখন পর্যন্ত কলেরা আক্রান্তের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে ডেঙ্গু ও অন্যান্য সংক্রামক রোগের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
সোমবার দুপুরে সচিবালয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে বন্যা পরিস্থিতিতে গৃহীত স্বাস্থ্য কার্যক্রম নিয়ে আয়োজিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।
১১ জেলায় বিশেষ স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, বর্তমানে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় বিশেষ স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
তিনি বলেন, বন্যা পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাকে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। এ কারণে এসব জেলার চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। প্রতিটি জেলার সার্বিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি তদারকির জন্য একজন করে জ্যেষ্ঠ চিকিৎসককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ সার্বক্ষণিক তথ্য সংগ্রহ, সমন্বয় ও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
এ ছাড়া জেলা প্রশাসন, সিভিল সার্জন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় রেখে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে গর্ভবতী নারী, নবজাতক, শিশু এবং দুর্গম এলাকার বাসিন্দাদের চিকিৎসাসেবায়।
প্রতিটি উপজেলায় মেডিকেল টিম
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বন্যাকবলিত প্রতিটি উপজেলায় মেডিকেল টিম চিকিৎসাসেবা দিচ্ছে। প্রয়োজন হলে রোগীদের দ্রুত হাসপাতালে স্থানান্তরের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, প্রয়োজনীয় ওষুধ, স্যালাইন, অ্যান্টিভেনম এবং অন্যান্য চিকিৎসাসামগ্রী দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে, যাতে স্বাস্থ্যসেবায় কোনো ধরনের বিঘ্ন না ঘটে।
পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনম ও চিকিৎসাসামগ্রী মজুত
বন্যার সময় সাপের উপদ্রব বাড়ায় চিকিৎসা প্রস্তুতিও জোরদার করা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মাঠপর্যায়ে ২১ হাজার ভায়াল এবং কেন্দ্রীয় চিকিৎসা সরঞ্জামাগারে (সিএমএসডি) আরও এক হাজার ভায়ালসহ মোট ২২ হাজার ভায়াল অ্যান্টি-স্নেক ভেনাম মজুত রয়েছে।
এ পর্যন্ত সাপের কামড়ে আক্রান্ত ৯৫ জনকে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া প্রায় ৭৫ লাখ ৮৫ হাজার প্যাকেট খাবার স্যালাইন (ওআরএস), প্রায় চার লাখ ব্যাগ কলেরা স্যালাইন এবং ৩৬ লাখের বেশি পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট মজুত রয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
কলেরা নয়, নজর ডেঙ্গু ও হামেও
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, বন্যাকবলিত এলাকায় এখন পর্যন্ত কলেরা আক্রান্তের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে সম্ভাব্য সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে সার্বক্ষণিক নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।
চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৮ হাজার ৩২৩ জন এবং মারা গেছেন ২৫ জন। গত বছরের একই সময়ে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৫৫।
অন্যদিকে, ১৫ মার্চ থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত হয়েছেন ১ লাখ ১১ হাজার ৪৮০ জন। এর মধ্যে পরীক্ষার মাধ্যমে ১৩ হাজার ৫০০ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। ইতোমধ্যে ৯০ হাজার ৬০৫ জন চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।
জরুরি প্রয়োজনে যোগাযোগের আহ্বান
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় অন্যান্য সরকারি সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
জরুরি স্বাস্থ্যসেবার জন্য জাতীয় স্বাস্থ্য বাতায়নের ১৬২৬৩ নম্বরে অথবা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুমের ০১৭৫৯-১১৪৪৮৮ নম্বরে যোগাযোগ করতে অনুরোধ জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে গুজবে বিভ্রান্ত না হয়ে সরকারি তথ্য অনুসরণ এবং অসুস্থ হলে নিকটস্থ মেডিকেল টিমের সহায়তা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
উপজেলা হাসপাতালে আধুনিক প্যাথলজি ল্যাব
এদিন সকালে রাজধানীর একটি অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, চলতি বছরের মধ্যেই দেশের প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আধুনিক প্যাথলজিক্যাল ল্যাব স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে চলতি মাসেই প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আমদানি শুরু হবে।
তিনি আরও বলেন, কিডনি রোগীদের চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে ৫০ শয্যার, জেলা হাসপাতালে ১০ শয্যার এবং উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালেও ১০ শয্যার ডায়ালাইসিস সেন্টার স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষা
মাঠপর্যায়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা আরও সহজলভ্য করতে নতুন উদ্যোগের কথাও জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, এখন থেকে প্রশিক্ষিত মিডওয়াইফ (ধাত্রী) ও কেয়ারগিভাররা বিশেষ স্ক্রিনিং যন্ত্র নিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করবেন।
এ ছাড়া পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচির অংশ হিসেবে মাতৃস্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে বিশেষ প্রচারণা কার্যক্রমও পরিচালনা করা হবে বলে জানান তিনি।
সংবাদ ব্রিফিংয়ে এক প্রশ্নের জবাবে আদ-দ্বীন হাসপাতাল প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় সংস্কারমূলক কাজ করছে। সেই কাজ শেষ হলে পুনরায় হাসপাতালটি পরিদর্শন করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
