বিলম্বে দেনমোহর পরিশোধে নারীর আর্থিক ক্ষতি ঠেকাতে নীতিমালা চেয়ে রিট; চার সপ্তাহের মধ্যে সংশ্লিষ্টদের জবাব দিতে নির্দেশ

  • দেনমোহর পরিশোধে নীতিমালা প্রণয়নের নির্দেশ কেন নয়, হাইকোর্টের রুল

বিয়ের সময় নির্ধারিত দেনমোহর নির্ধারিত ও যৌক্তিক সময়ের মধ্যে পরিশোধ এবং দীর্ঘ সময় পর আদায়ের ক্ষেত্রে মূল্যায়নের পদ্ধতি নির্ধারণে নীতিমালা প্রণয়নের নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে নারীর আর্থিক অধিকার সুরক্ষায় ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ১০ ধারার আওতায় প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়নের বিষয়েও ব্যাখ্যা চেয়েছেন আদালত।

সোমবার বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ জনস্বার্থে দায়ের করা এক রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে এ রুল জারি করেন।

রুলে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং বাংলাদেশ আইন কমিশনের চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্টদের চার সপ্তাহের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছে।

আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার ফাহমিদা আখতার। তিনি গত ৫ জুলাই জনস্বার্থে এ রিট আবেদন করেন।

রিটে যা বলা হয়েছে

রিট আবেদনে উল্লেখ করা হয়, বর্তমানে অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেনমোহরের একটি অংশ তাৎক্ষণিকভাবে পরিশোধ করা হলেও বাকি অংশ দীর্ঘ সময়ের জন্য বকেয়া রাখা হয়। কিন্তু বহু বছর পর সেই অর্থ পরিশোধের সময় মুদ্রাস্ফীতি ও টাকার ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় স্ত্রী তার প্রকৃত আর্থিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হন।

এ কারণে বিবাহের তারিখের এক বছর বা তার বেশি সময় পরে পরিশোধযোগ্য দেনমোহরের মূল্যায়ন, আদায়ের পদ্ধতি, নীতিমালা ও প্রক্রিয়া নির্ধারণ করে একটি স্পষ্ট নির্দেশিকা প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার কথা রিটে তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ১০ ধারার বিদ্যমান অস্পষ্টতা দূর করে নারীর ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার আবেদন জানানো হয়।

রিটে আরও বলা হয়, এ ধরনের নীতিমালা সংবিধানের ৭, ২৭, ২৮ ও ৩১ অনুচ্ছেদে বর্ণিত মৌলিক অধিকারের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।

আদালতের পর্যবেক্ষণ

শুনানিকালে আদালত পর্যবেক্ষণ করেন, আইন অনুযায়ী দেনমোহর মূলত ভবিষ্যতের জন্য অযৌক্তিকভাবে ফেলে রাখার বিষয় নয়। বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার সময় বা এর পরপরই দেনমোহর পরিশোধ করা স্বামীর আইনগত দায়িত্ব।

আদালত আরও বলেন, সামাজিক নানা কুপ্রথা ও প্রচলিত রীতির কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সময়মতো দেনমোহর পরিশোধ করা হয় না। ফলে আইন যথাযথভাবে প্রয়োগের পাশাপাশি এ বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানোও জরুরি।

শুনানিতে আদালত মন্তব্য করেন, দেনমোহর নির্ধারণের ক্ষেত্রে ধর্মীয় বিধানের পরিবর্তে লোক দেখানো বা অস্বাভাবিক অঙ্ক নির্ধারণ করার প্রবণতা থেকেও নানা জটিলতা তৈরি হচ্ছে। এ বিষয়ে ইসলামী শরিয়াহর মূলনীতি অনুসরণ করা প্রয়োজন।

দেনমোহর কেন গুরুত্বপূর্ণ

রুল জারির পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ব্যারিস্টার ফাহমিদা আখতার বলেন, ইসলামি আইন ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী বিয়ে একটি দেওয়ানি চুক্তি (সিভিল কন্ট্রাক্ট) এবং দেনমোহর সেই চুক্তির অপরিহার্য অংশ। বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দেনমোহর পরিশোধ করা স্বামীর আইনগত বাধ্যবাধকতা তৈরি হয় এবং এটি স্ত্রীর বৈধ আর্থিক অধিকার।

তিনি বলেন, তালাক স্বামী বা স্ত্রী, যে-ই দিক না কেন, দেনমোহর পরিশোধের দায়িত্ব থেকে স্বামী অব্যাহতি পান না। সম্পূর্ণ দেনমোহর পরিশোধ করতেই হবে।

স্বামীর মৃত্যুর পরও দাবি করা যাবে

আইনজীবী ফাহমিদা আখতার বলেন, দেনমোহর স্বামীর ওপর একটি ঋণের মতো বর্তায়। ফলে স্বামীর মৃত্যুর পরও স্ত্রী তার প্রাপ্য দেনমোহর স্বামীর রেখে যাওয়া সম্পত্তি থেকে আদায় করতে পারেন।

অন্যদিকে, স্ত্রী দেনমোহর আদায়ের আগেই মারা গেলে সেই অধিকারও বিলুপ্ত হয় না। এ ক্ষেত্রে তার বৈধ উত্তরাধিকারীরা মৃত নারীর প্রাপ্য দেনমোহর দাবি করতে পারবেন এবং প্রয়োজন হলে আদালতের মাধ্যমে তা আদায়ের উদ্যোগ নিতে পারবেন। স্ত্রী জীবিত থাকলেও তিনি নিজেই আদালতে মামলা করে দেনমোহর আদায় করতে পারেন।

মুদ্রাস্ফীতিতে কমে যায় প্রকৃত মূল্য

রিটকারীর আইনজীবী উদাহরণ দিয়ে বলেন, কোনো বিয়েতে যদি দুই লাখ টাকা দেনমোহর ধার্য করা হয় এবং তার মধ্যে এক লাখ টাকা তাৎক্ষণিক পরিশোধ করে বাকি এক লাখ টাকা বহু বছর পরে পরিশোধ করা হয়, তাহলে দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে সেই এক লাখ টাকার প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

ফলে কাগজে-কলমে দেনমোহর পরিশোধ হলেও বাস্তবে স্ত্রী তার ন্যায্য আর্থিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। এ কারণেই বিলম্বিত দেনমোহরের মূল্যায়নের একটি কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন সময়ের দাবি বলে রিটে উল্লেখ করা হয়েছে।

নীতিমালার উদ্দেশ্য

রিটে প্রস্তাবিত নীতিমালার মাধ্যমে বিয়ের তারিখ থেকে যৌক্তিক সময়ের মধ্যে দেনমোহর পরিশোধ নিশ্চিত করা, বিলম্বিত অর্থের মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতি স্পষ্ট করা এবং নারীর আর্থিক নিরাপত্তা ও আইনি অধিকার কার্যকরভাবে সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।

হাইকোর্টের এ রুলের মাধ্যমে দেনমোহর পরিশোধের বিদ্যমান প্রথা, আইনের বাস্তব প্রয়োগ এবং নারীর আর্থিক অধিকার সুরক্ষার বিষয়ে নতুন করে আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে।