অলস শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের কেন্দ্রে রূপান্তরের ঘোষণা

  • ব্যবসা সহজীকরণ, বন্দর দক্ষতা ও শিল্প সংস্কারে জোর বাণিজ্যমন্ত্রীর

দেশের অলস ও লোকসানি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ধাপে ধাপে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের কেন্দ্রে পরিণত করার ঘোষণা দিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেছেন, আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে এসব প্রতিষ্ঠানকে আধুনিকায়ন, পুনর্বিন্যাস ও বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে উৎপাদনমুখী খাতে ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।

বুধবার রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র-এ অনুষ্ঠিত ‘Dhaka Industrial Packaging Expo 2026’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশকে আগামী দিনের প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতিতে রূপান্তর করতে হলে ব্যবসা পরিচালনার জটিলতা কমানো, লজিস্টিক ব্যয় হ্রাস, বন্দর ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বৃদ্ধি এবং অলস রাষ্ট্রীয় সম্পদের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি বলেন, “পুরোনো সমস্যা নিয়ে পড়ে থাকলে সামনে এগোনো যাবে না। এখন সময় বাস্তবভিত্তিক সংস্কার এবং দ্রুত বাস্তবায়নের।”

তিনি জানান, বর্তমানে দেশে একটি ব্যবসা শুরু করতে উদ্যোক্তাদের প্রায় ২৫ থেকে ২৬ ধরনের অনুমোদন ও লাইসেন্স নিতে হয়, যা ব্যবসার পরিবেশকে জটিল করে তুলছে। এ পরিস্থিতি পরিবর্তনে সরকার ব্যবসা শুরু করার প্রক্রিয়া সহজীকরণে কাজ করছে।

মন্ত্রী বলেন, ভবিষ্যতে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) অথবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিবন্ধন সম্পন্ন হলেই উদ্যোক্তাদের প্রাথমিকভাবে একটি “প্রভিশনাল ক্লিয়ারেন্স” দেওয়া হবে। এর ফলে নতুন উদ্যোক্তারা দ্রুত ব্যবসায়িক কার্যক্রম শুরু করার সুযোগ পাবেন।

তিনি আরও বলেন, দেশের বন্দর ব্যবস্থাপনায় দক্ষতার ঘাটতির কারণে পণ্য পরিবহন ব্যয় বাড়ছে এবং এতে রপ্তানি খাতও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই সমস্যা সমাধানে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিদেশি অপারেটরদের সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, বাংলাদেশ এখন স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পথে রয়েছে। তাই সাময়িক বা “স্টপ-গ্যাপ” সমাধান দিয়ে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, “টেকসই সংস্কার কার্যক্রম ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করতেই হবে।”

বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে বর্তমানে প্রায় ৪০টি এবং বস্ত্র ও পাট খাতের অধীনে প্রায় ৫০টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে অলস বা লোকসানি অবস্থায় রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে সরকারের বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি ব্যয় হচ্ছে। এ অবস্থায় সরকার ধাপে ধাপে এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

তিনি বলেন, কোথাও আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে পুরোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরুজ্জীবিত করা হবে, কোথাও নতুন শিল্প গড়ে তোলা হবে এবং কিছু ক্ষেত্রে রপ্তানিমুখী উৎপাদনের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে। এর মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং শিল্পখাতের স্থবিরতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

বক্তব্যে তিনি বৈশ্বিক প্যাকেজিং শিল্পের সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন। তার মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে প্যাকেজিং শিল্পের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে এবং বাংলাদেশ এই খাতে বড় পরিসরে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন মোহাম্মদ হাসান আরিফ। তিনি দেশের রপ্তানি খাতে শিল্প বহুমুখীকরণ ও আধুনিক প্যাকেজিং ব্যবস্থার গুরুত্ব তুলে ধরেন।

শিল্পসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ বা লোকসানে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকরভাবে পুনর্বিন্যাস করা গেলে একদিকে যেমন নতুন বিনিয়োগ আসবে, অন্যদিকে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।