- ৫০ এমপির ৩৭ জন কোটিপতি পরিবারের, ৮৮ শতাংশ উচ্চশিক্ষিত
- মনোনয়ন প্রক্রিয়াকে ‘টোকেনিজম’ না করার আহ্বান সুজনের
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে নির্বাচিত ৫০ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ৩৭ জনই কোটিপতি পরিবারের সদস্য বলে জানিয়েছে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)। একই সঙ্গে নির্বাচিত নারী এমপিদের মধ্যে ৪৪ জন বা ৮৮ শতাংশই উচ্চশিক্ষিত। সংগঠনটি বলছে, সংরক্ষিত নারী আসনের বর্তমান পদ্ধতি দলীয় আনুকূল্যনির্ভর হয়ে পড়ছে, যা কার্যত ‘টোকেনিজমে’ রূপ নিচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (৭ মে) দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরে সুজন। “ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের তথ্য উপস্থাপন” শীর্ষক এই সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সুজনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকার। উপস্থিত ছিলেন ঢাকা মহানগরের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ক্যামেলিয়া চৌধুরী এবং কর্মসূচি ব্যবস্থাপক সজল কোরায়েশী।
সংগঠনটি জানায়, সংরক্ষিত নারী আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে প্রার্থীরা নির্বাচন কমিশনে যে হলফনামা জমা দিয়েছেন, সেগুলোর বিশ্লেষণ থেকেই এই তথ্য উঠে এসেছে। হলফনামায় প্রার্থীদের পাশাপাশি তাদের নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদের সম্পদ, আয়, ঋণ ও পেশাগত তথ্যও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
সুজনের তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচিত ৫০ নারী এমপির মধ্যে ৩৭ জনের পরিবারের সম্পদের পরিমাণ কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে বিএনপির রয়েছেন ২৭ জন এবং জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটের রয়েছেন ১০ জন। পাঁচ কোটি টাকার বেশি সম্পদ রয়েছে ২০ জন এমপির পরিবারের। এদের মধ্যে ১৯ জন বিএনপির এবং একজন জামায়াত জোটের। এছাড়া এক থেকে পাঁচ কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে আরও ১৭ জনের পরিবারের।
অন্যদিকে, মাত্র দুজন এমপির পরিবারের সম্পদ পাঁচ লাখ টাকার নিচে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের একজন বিএনপির এবং অন্যজন জামায়াত জোটের। এছাড়া বিএনপির একজন সদস্য হলফনামায় সম্পদের তথ্য উল্লেখ করেননি।
শিক্ষাগত যোগ্যতার দিক থেকেও নারী এমপিদের বড় অংশ উচ্চশিক্ষিত। ৫০ জনের মধ্যে ৩০ জন স্নাতকোত্তর এবং ১৪ জন স্নাতক ডিগ্রিধারী। উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বিএনপির ৩২ জন, জামায়াত জোটের ১১ জন এবং স্বতন্ত্র জোট থেকে নির্বাচিত একমাত্র সদস্যও রয়েছেন। এছাড়া দুজন নিজেদের স্বশিক্ষিত উল্লেখ করেছেন এবং একজন শিক্ষাগত যোগ্যতার ঘর পূরণ করেননি।
সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, সর্বোচ্চ আয়কারী ১০ নারী এমপির সবাই বিএনপির। বছরে কোটি টাকার বেশি আয় করে এমন পরিবারের সদস্য চারজন—শামীম আরা বেগম, জহরত আদিব চৌধুরী, সাকিলা ফারজানা ও আন্না মিনজ। এছাড়া বছরে ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা আয় করে এমন পরিবারের সদস্য রয়েছেন দুজন, তারাও বিএনপির।
অন্যদিকে, দুই লাখ টাকার কম আয় রয়েছে জামায়াত জোটের দুই এমপির পরিবারের। এছাড়া সাতজন এমপি হলফনামায় আয়ের তথ্য উল্লেখ করেননি।
ঋণ ও দায়দেনার তথ্য বিশ্লেষণ করে সুজন জানায়, নির্বাচিত নারী এমপিদের মধ্যে ১০ জনের পরিবারের ঋণ রয়েছে। এর মধ্যে চারজনের পরিবারের ঋণের পরিমাণ কোটি টাকার বেশি। তারা হলেন সেলিমা রহমান, হেলেন জেরিন খান, শিরীন সুলতানা ও নিপুণ রায় চৌধুরী। তারা সবাই বিএনপির সংসদ সদস্য।
আয়কর সংক্রান্ত তথ্যেও অসঙ্গতি দেখা গেছে। নির্বাচিত ৫০ এমপির মধ্যে ৪০ জন আয়কর দেওয়ার তথ্য জমা দিয়েছেন। বাকি ১০ জন হলফনামায় আয়কর বিবরণী দেননি। আয়কর দেওয়া ৪০ জনের মধ্যে ১৩ জন বছরে লাখ টাকার বেশি আয়কর দেন। তাদের মধ্যে ১২ জন বিএনপির এবং একজন জামায়াত জোটের। আবার চারজন বছরে পাঁচ হাজার টাকার কম আয়কর দেন।
পেশাগত পরিচয়ে সবচেয়ে বেশি রয়েছেন আইনজীবী। মোট ১৩ জন নারী এমপি আইন পেশার সঙ্গে যুক্ত। এর মধ্যে বিএনপির ১১ জন এবং জামায়াত জোটের দুইজন। এছাড়া ১০ জন ব্যবসায়ী, চারজন শিক্ষক, একজন চাকরিজীবী এবং পাঁচজন গৃহিণী রয়েছেন। ছয়জন পেশা হিসেবে রাজনীতিকে উল্লেখ করেছেন।
সংবাদ সম্মেলনে মামলার তথ্যও তুলে ধরা হয়। বর্তমানে ছয়জন নারী এমপির বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে এবং তারা সবাই বিএনপির। অতীতে মামলা ছিল ২১ জনের বিরুদ্ধে। বর্তমান ও অতীত—উভয় সময়ে মামলা ছিল বা রয়েছে এমন এমপির সংখ্যা চারজন। একজনের বিরুদ্ধে বর্তমানে ৩০২ ধারার মামলা রয়েছে এবং আরেকজনের বিরুদ্ধে অতীতেও একই ধরনের মামলা ছিল বলে জানানো হয়।
বয়স বিশ্লেষণে দেখা যায়, নির্বাচিত নারী এমপিদের মধ্যে ২৫ জনের বয়স ৩৬ থেকে ৫৫ বছরের মধ্যে। এছাড়া ৫৬ থেকে ৭৫ বছর বয়সী রয়েছেন ১৮ জন, ২৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী চারজন এবং ৭৫ বছরের বেশি বয়সী একজন। দুজন বয়স উল্লেখ করেননি।
মনোনয়ন বণ্টনে আঞ্চলিক বৈষম্যের অভিযোগও করেছে সুজন। সংগঠনটি জানায়, ঢাকা বিভাগে ১৩টি জেলা থাকলেও সেখান থেকে ১৯ জন এমপি মনোনয়ন পেয়েছেন। বিপরীতে রংপুর বিভাগে আটটি জেলা থাকলেও মনোনয়ন পেয়েছেন মাত্র দুইজন।
সংবাদ সম্মেলনে সুজন সংরক্ষিত নারী আসনের বর্তমান পদ্ধতিতে বেশ কয়েকটি সংস্কার প্রস্তাব তুলে ধরে। সংগঠনটি বলেছে, সংরক্ষিত নারী আসনের ব্যবস্থা যেন দলীয় নেতাদের অনুগ্রহনির্ভর ‘টোকেনিজমে’ পরিণত না হয়। বরং সাধারণ আসনের মতো প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে নারী সদস্য নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে।
এছাড়া সংরক্ষিত আসনের সদস্যদের জনগণের কাছে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, ঘূর্ণমান পদ্ধতিতে সরাসরি নির্বাচন চালু, সাধারণ আসনের সদস্যদের মতো সমান অধিকার ও কর্তৃত্ব নিশ্চিত করা এবং নারী রাজনীতিবিদদের যোগ্যতাকে মনোনয়নের প্রধান ভিত্তি করার সুপারিশ করা হয়।
সুজন আরও বলেছে, সংরক্ষিত নারী আসন যেন দলীয় প্রধানদের পৃষ্ঠপোষকতা বণ্টনের হাতিয়ারে পরিণত না হয়। একই সঙ্গে জাতীয় সংসদে নারীদের ৫০ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য সাধারণ আসনেও নির্দিষ্ট হারে নারী প্রার্থী মনোনয়ন বাধ্যতামূলক করার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
