ভর্তুকির চাপ বাড়ছে, বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন

বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয়ের পথে এগোচ্ছে সরকার। বাড়তে থাকা ভর্তুকির চাপ সামাল দিতে পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম পুনর্নির্ধারণের লক্ষ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সাম্প্রতিক প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়েছে, অর্থমন্ত্রীকে আহ্বায়ক করে গঠিত এই কমিটিতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী এবং বাণিজ্যমন্ত্রী সদস্য হিসেবে রয়েছেন। এছাড়া অর্থ বিভাগ, বিদ্যুৎ বিভাগ এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিবরা কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। ৯ এপ্রিল জারি হওয়া এ প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে সৃষ্ট সংকট মোকাবিলায় মূল্য সমন্বয়ের বিষয়ে সুপারিশ প্রণয়ন করবে কমিটি, যা পরে মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হবে।

সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) দেশে উৎপাদিত বিদ্যুতের একমাত্র ক্রেতা হিসেবে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে নির্ধারিত দামে বিদ্যুৎ কিনে থাকে। এরপর তা ছয়টি বিতরণ সংস্থার কাছে পাইকারি দামে বিক্রি করা হয়, যা পরবর্তীতে খুচরা পর্যায়ে ভোক্তাদের কাছে সরবরাহ করা হয়।

তবে বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় কম দামে বিদ্যুৎ সরবরাহ করায় প্রতি বছর সরকারকে বিপুল অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং অন্যান্য জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মার্চ ও এপ্রিল মাসেই স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনতে অতিরিক্ত প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছে। পাশাপাশি জ্বালানি তেলে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০০ কোটি টাকার ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। চলতি বাজেটে ভর্তুকির জন্য বরাদ্দ ৪২ হাজার কোটি টাকা থাকলেও জুন পর্যন্ত আরও প্রায় ৩৯ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত প্রয়োজন হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকেও ভর্তুকি কমিয়ে জ্বালানির দাম বাজারভিত্তিক করার পরামর্শ রয়েছে। ফলে অর্থনীতিতে বাড়তে থাকা চাপ বিবেচনায় সরকার মূল্য সমন্বয়ের বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করছে। যদিও মূল্যস্ফীতির প্রভাব ও সাধারণ মানুষের ওপর সম্ভাব্য চাপের কারণে এখনো সরাসরি দাম বাড়ানো হয়নি।

বিদ্যুতের দাম নির্ধারণে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) দায়িত্ব পালন করে। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, দাম বাড়ানোর জন্য বিপিডিবি ও বিতরণ সংস্থাগুলোকে বিইআরসির কাছে প্রস্তাব দিতে হয় এবং পরবর্তীতে গণশুনানির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে প্রয়োজনে সরকারের নির্বাহী আদেশেও মূল্য সমন্বয়ের সুযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকৃত খরচ নিরূপণ না করে দাম বাড়ানো যৌক্তিক হবে না। তিনি দাবি করেন, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে খাতে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।