শাপলা চত্বর তদন্তে একাত্তর টিভির লাইসেন্সপত্র চাইল ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা

২০১৩ সালের ৫ ও ৬ মে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশকে কেন্দ্র করে সংঘটিত ঘটনার তদন্তে নতুন পদক্ষেপ নিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। তদন্ত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল একাত্তর টিভির সম্প্রচার লাইসেন্স এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র জমা দিতে বলা হয়েছে।

তদন্ত সংস্থার কো-অর্ডিনেটর মুহম্মদ শহীদুল্যাহ্ চৌধুরীর স্বাক্ষরিত একটি চিঠি গত ৮ জুন একাত্তর টিভির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার (সিইও) কার্যালয়ে পাঠানো হয়। চিঠিটি ‘গোপনীয়’ ও ‘অতীব জরুরি’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সংঘটিত ঘটনাকে ঘিরে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের তদন্ত চলছে। ‘দ্য ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইব্যুনালস) অ্যাক্ট, ১৯৭৩’-এর ৩(২) ধারা অনুযায়ী তদন্ত কর্মকর্তা ফতেহ্ মো. ইফতেখারুল আলম এ অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।

তদন্তের স্বার্থে সরকার থেকে একাত্তর টেলিভিশনকে দেওয়া সম্প্রচার লাইসেন্সের অনুলিপি এবং লাইসেন্স-সংক্রান্ত অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সরবরাহের আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা। সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য চ্যানেলটির সিইওর কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হয়।

সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কমপ্লেইন্ট রেজিস্ট্রার ক্রমিক নম্বর-১৪৬ এবং আইসিটি বিডি মিস কেস নম্বর-১৫/২০২৫-এর আওতায় এই চিঠি ইস্যু করা হয়েছে। বিষয়টিকে জাতীয় গুরুত্বসম্পন্ন উল্লেখ করে তদন্তে সর্বাত্মক সহযোগিতা কামনা করা হয়েছে।

শাপলা চত্বরের ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় একাত্তর মিডিয়া লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল হক বাবু এবং একাত্তর টেলিভিশনের সাবেক প্রধান প্রতিবেদক ফারজানা রুপা আসামি হিসেবে রয়েছেন।

এদিকে গত ৮ জুন মামলার অগ্রগতি নিয়ে শুনানিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ সাবেক শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি, মোজাম্মেল হক বাবু ও ফারজানা রুপাকে একদিন জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেয়। একই সঙ্গে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আগামী ১০ আগস্ট নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হয়।

মামলায় বর্তমানে গ্রেপ্তার হওয়া আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক মন্ত্রী দীপু মনি, সাংবাদিক মোজাম্মেল হক বাবু ও ফারজানা রুপা, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির, অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক এবং সাবেক উপমহাপরিদর্শক মোল্যা নজরুল ইসলাম।

অন্যদিকে মামলার আরও কয়েকজন আসামি পলাতক রয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর, সাবেক আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার, বেনজীর আহমেদ এবং গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার।

মামলার বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, শাপলা চত্বরের ঘটনাকে ঘিরে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামে অন্তত ৫৮ জন নিহত হওয়ার তথ্য তদন্তে পাওয়া গেছে। নিহতদের পরিচয়ও শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে বলে তিনি জানান।

চলতি বছরের ১৪ মে এই মামলায় দীপু মনি, মোজাম্মেল হক বাবু এবং ফারজানা রুপাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

হেফাজতে ইসলামের আত্মপ্রকাশ ঘটে ২০১০ সালে নারী উন্নয়ন নীতি ও শিক্ষানীতির বিরোধিতার মধ্য দিয়ে। পরে ব্লগারদের শাস্তির দাবিতে ২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে সমাবেশ করে সংগঠনটি। ওই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সহিংস পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে রাতে যৌথ বাহিনী অভিযান চালিয়ে সমাবেশস্থল খালি করে।

মানবাধিকার সংগঠন অধিকার তাদের প্রতিবেদনে ওই অভিযানে ৬১ জন নিহত হওয়ার দাবি করেছিল। তবে সে সময় পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, অভিযানে কেউ নিহত হয়নি; বরং সারাদিনের সংঘর্ষে ১১ জনের মৃত্যু ঘটে।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ২০ আগস্ট শাপলা চত্বরের ঘটনা নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দায়ের করা হয়। অভিযোগে শেখ হাসিনা, শাহরিয়ার কবির, অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন এবং ইমরান এইচ সরকারসহ ১৯ জনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়।

এর আগে একই ঘটনায় জলিল মণ্ডলসহ ১২ জনের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলাও দায়ের করা হয়েছিল। ওই মামলায় দ্বিতীয় আসামি হিসেবে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হলে তাকে আটক করে কারাগারে পাঠানো হয়।

২০২৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ফারজানা রুপাকে আটক করা হয়। এর আগে ৮ আগস্ট একাত্তর টেলিভিশন কর্তৃপক্ষ তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয়। অন্যদিকে একই বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর ভোরে ময়মনসিংহের ধোবাউড়া সীমান্ত এলাকা থেকে মোজাম্মেল হক বাবুকে গ্রেপ্তার করা হয়।