প্রস্তাবিত বাজেটে তামাক নিয়ন্ত্রণে ঘাটতি, বাড়তে পারে ব্যবহার ও স্বাস্থ্যঝুঁকি: প্রজ্ঞা-আত্মা

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে তামাকপণ্যের ওপর কর ও মূল্য কাঠামোয় কার্যকর সংস্কার না থাকায় তামাকপণ্য আরও সহজলভ্য হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান) এবং অ্যান্টি টোব্যাকো মিডিয়া এলায়েন্স (আত্মা)। সংগঠন দুটির মতে, এতে একদিকে যেমন তামাক ব্যবহার বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে, অন্যদিকে সরকার সম্ভাব্য অতিরিক্ত রাজস্ব আহরণের সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হবে।

বৃহস্পতিবার (১১ জুন) গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠন দুটি জানায়, প্রস্তাবিত বাজেটে নিম্নস্তরের সিগারেটের মূল্য সামান্য বৃদ্ধি করা হলেও বিড়ি, জর্দা ও গুলের দাম এবং করহার অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। মূল্যস্ফীতি ও মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির বাস্তবতায় এসব পণ্যের প্রকৃত মূল্য আরও কমে যাবে, ফলে সেগুলো সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আরও বেশি চলে আসবে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, প্রস্তাবিত বাজেটে নিম্নস্তরের প্রতি ১০ শলাকা সিগারেটের খুচরা মূল্য ৬০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে এই স্তরে মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ, যা একই সময়ে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির হার ১০ দশমিক ২৭ শতাংশের তুলনায় অনেক কম। এর ফলে নিম্নস্তরের সিগারেটের প্রকৃত মূল্য হ্রাস পাবে এবং বিশেষ করে তরুণ ও নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে এর ব্যবহার আরও বাড়তে পারে। বর্তমানে দেশের মোট সিগারেট বাজারের প্রায় ৭৫ শতাংশই নিম্নস্তরের সিগারেটের দখলে, যার প্রধান ভোক্তা দরিদ্র ও তরুণ জনগোষ্ঠী।

সংগঠন দুটি আরও জানায়, মধ্যম স্তরের প্রতি ১০ শলাকা সিগারেটের মূল্য ৮০ টাকা থেকে ৯২ টাকা, উচ্চ স্তরের মূল্য ১৪০ টাকা থেকে ১৬০ টাকা এবং প্রিমিয়াম স্তরের মূল্য ১৮৫ টাকা থেকে ২১০ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে তুলনা করলে এই বৃদ্ধি খুবই সীমিত। পাশাপাশি কর কাঠামোয় কোনো মৌলিক সংস্কার না থাকায় মূল্যবৃদ্ধির একটি বড় অংশ তামাক কোম্পানিগুলোর অতিরিক্ত মুনাফা হিসেবে থেকে যাবে, যা ভবিষ্যতে তামাক ব্যবসা সম্প্রসারণে ব্যবহৃত হতে পারে।

প্রজ্ঞা ও আত্মার মতে, নিম্ন ও মধ্যম স্তরের সিগারেটকে একীভূত করে প্রতি ১০ শলাকার মূল্য ১০০ টাকা নির্ধারণ, বিদ্যমান সম্পূরক শুল্কের পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট কর আরোপ এবং সব ধরনের তামাকপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি করা হলে সরকার চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আয় করতে পারবে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে প্রায় চার লাখ অকাল মৃত্যু প্রতিরোধ করাও সম্ভব হবে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর বিড়ি, জর্দা ও গুলের দাম এবং করহার অপরিবর্তিত রাখার ফলে এসব পণ্য আরও সস্তা হবে। এর প্রভাব নারী ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর বেশি পড়বে এবং তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়বে।

এ ছাড়া বাজেটে ১০ গ্রাম নিকোটিন পাউচের খুচরা মূল্য ৫০০ টাকা ও ৪০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক এবং ১০ শলাকা হিটেড টোব্যাকোর খুচরা মূল্য ২১০ টাকা ও ৬৭ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। যদিও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এসব পণ্য নিষিদ্ধ করার সুপারিশ করেছিল, সংশোধিত তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনে তা অন্তর্ভুক্ত হয়নি। ফলে নতুন ধরনের তামাকপণ্য ব্যবহারের মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

এছাড়া নিকোটিন গ্র্যানুলস ও নিকোটিন পাউচ আমদানির ওপর ৩৫০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ এবং তামাকপণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহ পর্যবেক্ষণে ‘ট্র্যাক অ্যান্ড ট্রেস’ ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাবকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত বাজেট সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের বলেন, প্রস্তাবিত বাজেট অপরিবর্তিত অবস্থায় পাস হলে তামাকপণ্য আরও সস্তা ও সহজলভ্য হয়ে উঠবে। এতে তরুণ ও নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে তামাক ব্যবহারের প্রবণতা বাড়বে এবং তামাকজনিত রোগ ও মৃত্যুর হারও বৃদ্ধি পাবে।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, দেশে বর্তমানে ৩৫ দশমিক ৩ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ কোনো না কোনো ধরনের তামাকপণ্য ব্যবহার করেন। তামাকজনিত রোগে প্রতিবছর প্রায় দুই লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর তামাকের কারণে বছরে প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে।

এ প্রেক্ষাপটে চূড়ান্ত বাজেটে তামাকবিরোধী সংগঠনগুলোর প্রস্তাবিত কর ও মূল্য সংস্কার অন্তর্ভুক্ত করে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং রাজস্ব আয় বৃদ্ধির সুযোগ কাজে লাগানোর জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে প্রজ্ঞা ও আত্মা।