গ্যাস সংকট কাটতে লাগতে পারে দুই সপ্তাহ

মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর দেশে গ্যাস সরবরাহ এখনো স্বাভাবিক হয়নি। পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরও এক থেকে দুই সপ্তাহ সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। এর মধ্যে আবাসিক, শিল্প, সিএনজি ও বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস সংকট আরও কিছুদিন অব্যাহত থাকার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

গত মঙ্গলবার মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে (এফএসআরইউ) শর্ট সার্কিট থেকে আগুন লাগে। দুর্ঘটনার পর টার্মিনালটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমে যায়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালটি পুরোপুরি সচল করতে সাত থেকে ১৫ দিন সময় লাগতে পারে। এরই মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ ও কেবল মেরামতের জন্য যুক্তরাজ্য থেকে প্রকৌশলী আনা হয়েছে। তারা টার্মিনাল সচল করার কাজ করছেন।

দেশে বর্তমানে দৈনিক প্রায় ২৬৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে আমদানি করা এলএনজি থেকে ৯০ থেকে ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়। একটি টার্মিনাল বন্ধ থাকায় এলএনজি সরবরাহ কমেছে প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট।

ফলে বর্তমানে মোট গ্যাস সরবরাহ নেমে এসেছে প্রায় ২২০ কোটি ঘনফুটে। যেখানে দেশের দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। এর আগে থেকেই চাহিদার তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ কম গ্যাস সরবরাহ হচ্ছিল, এখন সংকট আরও বেড়েছে।

কবে স্বাভাবিক হবে সরবরাহ

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আগুনে টার্মিনালের বয়লারের কেবলসহ গুরুত্বপূর্ণ বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব যন্ত্রাংশ প্রতিস্থাপন ও মেরামতের কাজ চলছে। সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত টার্মিনাল চালুর তাগিদ দেওয়া হলেও এক্সিলারেট এনার্জি এখনো নির্দিষ্ট সময় জানাতে পারেনি।

সূত্রের মতে, আগামী পাঁচ থেকে আট দিনের মধ্যে টার্মিনাল আংশিকভাবে চালু করা সম্ভব হলে দৈনিক প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা যেতে পারে। তবে পুরো সক্ষমতায় ফিরতে ১০ থেকে ১৫ দিন সময় লাগতে পারে।

পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন) রফিকুল ইসলাম জানান, শর্ট সার্কিটের কারণে কেবল পুড়ে গেছে। বিদেশি প্রকৌশলীরা মেরামতের কাজ করছেন। কাজ শেষ হওয়ার নির্দিষ্ট সময় এখনই বলা যাচ্ছে না।

জ্বালানি বিভাগের যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, দ্রুত টার্মিনাল চালুর জন্য এক্সিলারেট এনার্জিকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কিছু যন্ত্রাংশ বিদেশ থেকে আনার প্রয়োজন হতে পারে।

আবাসিকে ভোগান্তি

গ্যাস সংকটে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন আবাসিক গ্রাহকেরা। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দিনের অধিকাংশ সময় চুলায় গ্যাসের চাপ কম থাকছে। অনেক বাসায় রান্না করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, কলাবাগান, কাঁঠালবাগান, মিরপুর, বাড্ডা, রামপুরা ও বাসাবোসহ বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক পরিবার বিকল্প হিসেবে বৈদ্যুতিক চুলা ও ইন্ডাকশন ব্যবহার করছেন। কেউ কেউ গভীর রাতে গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়লে তখন রান্না করে রাখছেন।

সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ লাইন

গ্যাস সংকটের কারণে সিএনজি স্টেশনগুলোতেও ভোগান্তি বেড়েছে। রাজধানী থেকে জেলা শহর পর্যন্ত অনেক স্টেশনে দীর্ঘ সময় ধরে যানবাহনের সারি দেখা যাচ্ছে।

সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভারশন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ফারহান নূর বলেন, একটি সিএনজি স্টেশন স্বাভাবিকভাবে পরিচালনার জন্য অন্তত ১৫ পিএসআই গ্যাসচাপ প্রয়োজন। কিন্তু অনেক এলাকায় চাপ ৪ থেকে ৫ পিএসআইয়ে নেমে এসেছে, কোথাও এর চেয়েও কম। ফলে স্বাভাবিকভাবে গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।

শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে প্রভাব

গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে শিল্প খাতেও। অনেক কারখানায় উৎপাদন কমাতে হয়েছে। কোথাও ডিজেল ও এলপিজির মতো বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হচ্ছে, এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।

শিল্প উদ্যোক্তারা আশঙ্কা করছেন, সংকট দীর্ঘায়িত হলে রপ্তানি কার্যক্রমেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

এদিকে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনেও প্রভাব পড়েছে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) জানিয়েছে, বর্তমানে বিদ্যুৎ খাতে দৈনিক প্রায় ৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। টার্মিনাল দুর্ঘটনার আগে এই সরবরাহ ছিল প্রায় ৯০ কোটি ঘনফুট।

এর ফলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন কমে প্রায় ৪ হাজার মেগাওয়াটে নেমে এসেছে। আগে এসব কেন্দ্র থেকে ৫ থেকে ৬ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন হতো।

কর্মকর্তারা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে বৃষ্টি ও ছুটির কারণে বিদ্যুতের চাহিদা কম থাকায় বড় ধরনের লোডশেডিং হয়নি। তবে তাপমাত্রা বাড়লে এবং শিল্পকারখানা পুরোদমে চালু হলে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়বে, তখন লোডশেডিংয়ের চাপও বাড়তে পারে।

এলএনজি সরবরাহে নির্ভরতা

বাংলাদেশে ২০১৮ সালে এলএনজি আমদানি শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এক্সিলারেট এনার্জি মহেশখালীতে দেশের প্রথম ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল চালু করে। পরে ২০২০ সালে একই এলাকায় দ্বিতীয় ভাসমান টার্মিনাল চালু করে সামিট গ্রুপ।

দুটি টার্মিনালের ওপর দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার বড় অংশ নির্ভরশীল হওয়ায় যেকোনো একটি টার্মিনালে সমস্যা দেখা দিলেই জাতীয় গ্রিডে সংকট তৈরি হচ্ছে।

জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে গ্যাস সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বৃদ্ধি এবং বিকল্প জ্বালানি উৎস তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।