‘সরকারি অফিসে যত কম যেতে হবে, দুর্নীতি তত কমবে’: অর্থমন্ত্রী

  • ডিজিটাল সেবা বাড়ানোর পাশাপাশি অটোমেশনে জোর

সরকারি সেবা নিতে মানুষের সরাসরি অফিসে যাওয়ার প্রয়োজন যত কমানো যাবে, দুর্নীতি ও হয়রানির সুযোগও তত কমবে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি খাতে ডিজিটালাইজেশন, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, অটোমেশন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর বনানীর একটি হোটেলে ট্রাস্ট ব্যাংক আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন অর্থমন্ত্রী। সর্বজনীন পেনশন স্কিমের আওতায় গ্রাহকদের লেনদেন আরও সহজ ও ডিজিটাল করতে ‘ডায়নামিক বাংলা কিউআর’ সেবা চালুর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয় অনুষ্ঠানে।

‘সরকারি অফিসে কম যেতে হলে দুর্নীতিও কমবে’

অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, সরকারি অফিসে মানুষকে যত কম যেতে হবে, দুর্নীতির সুযোগ তত কমবে। এতে মানুষের সময়ও বাঁচবে এবং সরকারি সেবার মান উন্নত হবে।

তিনি বলেন, এ কারণে ডিজিটালাইজেশন এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানো জরুরি। সরাসরি শারীরিক উপস্থিতি ছাড়া সেবা দেওয়ার ব্যবস্থা যত বেশি করা যাবে, মানুষের হয়রানি তত কমবে।

আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য অটোমেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারেরও কোনো বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।

অটোমেশনে ব্যবসায়িক খরচ কমানোর তাগিদ

বন্দর, বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, যত বেশি অটোমেশন করা যাবে, ব্যবসার খরচ তত কমবে।

তিনি বলেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের সক্ষমতা বা ইন্টারঅপারেবিলিটি তৈরি করে ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করতে হবে। ব্যবসায়ীদের সাধারণ অভিযোগ হচ্ছে, তাঁরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে হয়রানির শিকার হন, কাজে দেরি হয় এবং কাঙ্ক্ষিত সেবা পান না।

ইন্টারঅপারেবিলিটির মাধ্যমে ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করা গেলে এসব সমস্যা কমবে এবং ব্যবসা পরিচালনা আরও সহজ হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

‘ডায়নামিক বাংলা কিউআর’ চালু

অনুষ্ঠানে ট্রাস্ট ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মোহা. হোসাইন আল মোর্শেদ বলেন, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও ডিজিটাল আর্থিক সেবার অগ্রযাত্রায় ডায়নামিক বাংলা কিউআর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তিনি বলেন, মানুষ কোনো আর্থিক সেবা গ্রহণ করবে কি না, তা অনেকাংশে নির্ভর করে সেবাটি কতটা সহজ, দ্রুত ও নিরাপদ তার ওপর।

একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, আত্মকর্মসংস্থানে নিয়োজিত ব্যক্তি বা তরুণ উদ্যোক্তার কাছে প্রতি মাসে পেনশন স্কিমে টাকা জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া জটিল মনে হলে নিয়মিত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা কঠিন হবে। এ জায়গায় ডায়নামিক বাংলা কিউআর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে জানান তিনি।

বাংলা কিউআরে লেনদেন বাড়ছে

বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর মোহাম্মদ কবির আহাম্মদ বলেন, দেশে বাংলা কিউআরের মাধ্যমে লেনদেনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে।

তিনি জানান, বর্তমানে ব্যাংক, এমএফএস ও এমপিএসপির গ্রাহকেরা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে দেশব্যাপী প্রায় ৩২ লাখ ৬১ হাজার মার্চেন্টের কাছে বাংলা কিউআর স্ক্যান করে অর্থ পরিশোধের সুযোগ পাচ্ছেন।

জুনে যেখানে প্রতিদিন গড়ে ২৮ কোটি টাকা বাংলা কিউআরের মাধ্যমে লেনদেন হতো, বর্তমানে তা ১৩৭ কোটি টাকার বেশি হয়েছে বলে জানান তিনি।

ব্যক্তিপর্যায়ে বাংলা কিউআর চালু নভেম্বরে

বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর জানান, আগামী ১ নভেম্বর থেকে ব্যক্তিপর্যায়ের লেনদেনেও বাংলা কিউআর চালু করা হবে।

এ ছাড়া সরকারি পরিষেবা বিলের কপিতে ডায়নামিক বাংলা কিউআর চালুর লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সরকারের বিভিন্ন দপ্তর ও অধিদপ্তর কাজ করছে।

এটি চালু হলে যেকোনো জায়গা থেকে সরকারি পরিষেবা বিল পরিশোধ করা সম্ভব হবে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, যোগাযোগসহ বিভিন্ন সরকারি ও সামাজিক সুরক্ষা সেবা এবং সর্বজনীন পেনশন স্কিমেও বাংলা কিউআর লেনদেন চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সর্বজনীন পেনশনে ডিজিটাল লেনদেনের গুরুত্ব

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান মো. সুরাতুজ্জামান বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা চালু রয়েছে। বাংলাদেশে মূলত দক্ষিণ কোরিয়ার মডেল অনুসরণ করে এ ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, মানুষের গড় আয়ু বাড়ছে। ফলে ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ভবিষ্যতে আরও বাড়বে। এই বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।

তিনি আরও জানান, ভবিষ্যতে শরিয়াহভিত্তিক পেনশন স্কিম চালুর বিষয়েও চিন্তাভাবনা রয়েছে।

নগদবিহীন লেনদেনে ট্রাস্ট ব্যাংকের সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি

অনুষ্ঠানে ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আহসান জামান চৌধুরী বলেন, সরকার যে নগদবিহীন লেনদেনের ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে, সে ক্ষেত্রে ট্রাস্ট ব্যাংক দায়িত্ব, নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে কাজ করবে।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ট্রাস্ট ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মোহা. হোসাইন আল মোর্শেদ, বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর মোহাম্মদ কবির আহাম্মদ, জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান মো. সুরাতুজ্জামান এবং ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আহসান জামান চৌধুরীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।