- কার্নিশে ঝুলন্ত তরুণকে গুলির মামলায় রায়
জুলাই আন্দোলনে রাজধানীর রামপুরায় কার্নিশে ঝুলন্ত তরুণকে গুলি এবং প্রাণহানির ঘটনায় পাঁচ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর দেওয়া রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। তাদের দাবি, সাক্ষ্য-প্রমাণের মাধ্যমে আসামিদের অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলেই ট্রাইব্যুনাল সর্বোচ্চ শাস্তি দিয়েছেন। অন্যদিকে, রায়কে ত্রুটিপূর্ণ ও অন্যায্য দাবি করে উচ্চ আদালতে আপিল করার ঘোষণা দিয়েছে আসামিপক্ষ। একই সঙ্গে দণ্ডপ্রাপ্ত এক পুলিশ সদস্যের পরিবারও রায়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।
রোববার দুপুরে দেওয়া রায়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, খিলগাঁও অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার রাশেদুল ইসলাম এবং রামপুরা থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মশিউর রহমানকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। একই মামলায় সাবেক উপপরিদর্শক তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়াকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ির সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে বর্তমানে কেবল চঞ্চল চন্দ্র সরকার কারাগারে রয়েছেন।
রাষ্ট্রপক্ষ: অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত
রায় ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি আমিনুল ইসলাম বলেন, মামলাটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় ট্রাইব্যুনাল তিন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড, একজনকে যাবজ্জীবন এবং একজনকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন।
তিনি জানান, আদালতে ভিডিওচিত্র এবং তৎকালীন পুলিশ কমিশনার হাবিবুর রহমানের বেতার বার্তার নথি উপস্থাপন করা হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, হাবিবুর রহমান দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে অধীনস্থ পুলিশ সদস্যদের উসকানি দিয়েছেন এবং হত্যাকাণ্ডে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রেখেছেন।
পুরস্কার দেওয়ার অভিযোগ
আমিনুল ইসলাম দাবি করেন, ১৯ জুলাই হত্যাকাণ্ডের পর ২১ বা ২২ জুলাই অভিযানে অংশ নেওয়া প্রত্যেক সদস্যকে এক হাজার টাকা এবং সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে এক লাখ টাকা পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল।
নৃশংসতার বর্ণনা রাষ্ট্রপক্ষের
প্রধান কৌঁসুলি বলেন, বাসেত খান মুসা নামের এক শিশুকে মাথায় গুলি করা হয়। গুলিটি শিশুটির মাথা ভেদ করে তার দাদির শরীরে লাগে এবং ঘটনাস্থলেই তিনি মারা যান। একইভাবে নাদিম মিজানকে মসজিদ থেকে ফেরার পথে গুলি করে হত্যা করা হয়।
তিনি আরও বলেন, আত্মরক্ষার জন্য কার্নিশে ঝুলে থাকা আমির হোসেনকে নিচে লাফ দিতে বলা হয়েছিল। তিনি রাজি না হওয়ায় ঝুলন্ত অবস্থাতেই তাকে ছয়টি গুলি করা হয়, যার ফলে তিনি স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেন। এসব ঘটনার ভয়াবহতার কারণেই ট্রাইব্যুনাল আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি দিয়েছেন।
পলাতকদের ফেরাতে উদ্যোগ
পলাতক আসামিদের বিষয়ে প্রধান কৌঁসুলি জানান, তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে এবং দেশে ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থার সহায়তা নেওয়া হচ্ছে।
আসামিপক্ষের দাবি: রায়ে গুরুতর ত্রুটি রয়েছে
২০ বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত চঞ্চল চন্দ্র সরকারের আইনজীবী সরোয়ার জাহান নিপ্পন বলেন, মামলার ভিত্তি হিসেবে এমন একটি বিচারবহির্ভূত স্বীকারোক্তিকে গ্রহণ করা হয়েছে, যা আইনের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়। এ বিষয়ে তারা বারবার আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও তা বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।
তিনি দাবি করেন, ঘটনার দিন তার মক্কেলের কাছে কোনো অস্ত্র ছিল না এবং তিনি টেলিভিশন ভবনে দায়িত্ব পালন করছিলেন। কলের তথ্য, নজরদারি চিত্র এবং অন্যান্য তথ্যেও সেটি প্রতীয়মান হয়েছে। বিচার কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর একটি ভিডিওর ভিত্তিতে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। এ কারণে তারা উচ্চ আদালতের আপিল বিভাগে যাবেন।
পরিবারের দাবি: নির্দোষ ব্যক্তিকে সাজা দেওয়া হয়েছে
চঞ্চল চন্দ্র সরকারের ছোট ভাই উৎপল চন্দ্র সরকার বলেন, প্রসিকিউশন পক্ষের উপস্থাপিত নথিতেই দেখা যায়, তার ভাই বিকেল ৩টা ৪৫ মিনিট পর্যন্ত রামপুরা টেলিভিশন ভবনের তিন নম্বর ফটকে দায়িত্ব পালন করছিলেন। অথচ তার বিরুদ্ধে আনা তিনটি অভিযোগের সময় ছিল দুপুর ২টা থেকে ৩টার মধ্যে। তাই ওই সময়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে অপরাধ সংঘটনের প্রশ্নই আসে না।
তিনি আরও বলেন, ঘটনার দিন তার ভাইয়ের নামে কোনো অস্ত্র বা গুলি বরাদ্দ ছিল না। অথচ যাদের নামে অস্ত্র বরাদ্দ ছিল, তাদের অনেকেই এ মামলায় দণ্ডিত হননি। বিচার চলাকালে এ বিষয়ে ট্রাইব্যুনাল প্রসিকিউশনকে প্রশ্ন করলেও তারা সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেনি।
‘জোর করে ভিডিও নেওয়া হয়েছে’
উৎপলের অভিযোগ, ২৬ জুলাই তার ভাইকে পুলিশ ফাঁড়ি থেকে সরিয়ে নেওয়া হলেও ২৮ জুলাই তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এই দুই দিনের মধ্যে জোরপূর্বক তার কাছ থেকে ভিডিও ধারণ করা হয়েছে বলে পরিবারের দাবি।
সংখ্যালঘু হওয়ার অভিযোগ
রায়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে উৎপল চন্দ্র সরকার বলেন, “আমাদের কাছে ২০ বছরের সাজা বড় বিষয় নয়। আমরা মনে করি, সংখ্যালঘু হওয়াটাই আজ আমাদের সবচেয়ে বড় অপরাধ।”
