তৃতীয় বা পরবর্তী সন্তানের ক্ষেত্রে মাতৃত্বকালীন ছুটি ও সংশ্লিষ্ট সুবিধা সীমিত করার আইনি বিধান কেন সংবিধানবিরোধী ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে চাকরিতে ন্যূনতম ছয় মাস পূর্ণ না হলে মাতৃত্বকালীন ছুটি না দেওয়ার বিধানও রুলে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে।
সোমবার (২৯ জুন) জনস্বার্থে দায়ের করা এক রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি শেষে বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি মো. আসিফ হাসানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রুল জারি করেন।
রুলের জবাব দিতে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, আইন মন্ত্রণালয়ের দুই সচিব, জনপ্রশাসন সচিব, নারী ও শিশুবিষয়ক সচিব, সমাজকল্যাণ সচিব, স্বাস্থ্য সচিবসহ মোট ১৩ জন বিবাদীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী ইশরাত হাসান। তাঁর সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী তানজিলা রহমান, মো. বাহাউদ্দিন আল ইমরান ও ইফাত হাসান শাম্মি। গত ১৫ জুন কর্মজীবী নারীদের মাতৃত্বকালীন অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এই রিট আবেদনটি করা হয়।
শুনানি শেষে আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, শ্রম আইনের ৪৬(১) ও ৪৬(২) ধারায় বলা হয়েছে, প্রসবের আগে কোনো প্রতিষ্ঠানে অন্তত ছয় মাস চাকরি না করলে কোনো নারী মাতৃত্বকালীন ছুটি বা সুবিধা পাবেন না। একই আইনে আরও বলা হয়েছে, প্রসবের সময় আগের দুটি সন্তান জীবিত থাকলে তৃতীয় সন্তানের ক্ষেত্রে তিনি মাতৃত্বকালীন ছুটির অধিকারী হবেন না।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ সেবা বিধিমালার ১৯৭ নম্বর বিধিতে সরকারি চাকরিজীবী নারীদের জন্য পুরো চাকরিজীবনে দুইবারের বেশি মাতৃত্বকালীন ছুটি না দেওয়ার বিধান রয়েছে। ফলে সরকারি ও বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রেই তৃতীয় সন্তানের জন্য মাতৃত্বকালীন ছুটির সুযোগ সীমিত করা হয়েছে।
মাতৃত্বকালীন ছুটি কোনো পুরস্কার নয়, বরং মা ও নবজাতকের প্রয়োজন উল্লেখ করে ইশরাত হাসান বলেন, প্রথম সন্তানের মতো তৃতীয় সন্তানের ক্ষেত্রেও মা ও শিশুর স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকে, বরং অনেক ক্ষেত্রে তা আরও বেশি হতে পারে। শিশুর সুস্থ শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য অন্তত ছয় মাস বুকের দুধ পান নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শুধুমাত্র তৃতীয় সন্তান হওয়ার কারণে কোনো শিশুকে এই মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যায় না।
বর্তমান আইনের কারণে কর্মজীবী নারীরা কর্মক্ষেত্র ও পারিবারিক দায়িত্বের মধ্যে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, নারীদের উন্নয়নের কথা বলা হলেও মাতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তাদের কর্মস্থলে যেতে বাধ্য করা হচ্ছে। এর ফলে অনেক নারীকে চাকরি ও পরিবার, এই দুইয়ের মধ্যে একটি বেছে নেওয়ার পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য অভিন্ন নীতিমালা না থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠান নিজেদের মতো করে মাতৃত্বকালীন সুবিধা সীমিত করছে।
রিট আবেদনে বলা হয়েছে, মাতৃত্বকালীন সুবিধা কোনো জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের উপায় নয়; এটি মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্য, মর্যাদা এবং সাংবিধানিক অধিকারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
আইনজীবী ইশরাত হাসান জানান, হাইকোর্ট জানতে চেয়েছেন, শ্রম আইন ও বাংলাদেশ সেবা বিধিমালার সংশ্লিষ্ট বিধানগুলো কেন সংবিধানের ৭, ১৫, ১৮, ২৬, ২৭, ২৮, ২৯, ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদের পরিপন্থী এবং অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না।
একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতের কর্মজীবী নারীদের জন্য সমান মাতৃত্বকালীন সুরক্ষা ও সুবিধা নিশ্চিত করতে সরকার কেন ব্যর্থ হয়েছে এবং এ বিষয়ে কেন একটি অভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে না, তাও রুলে জানতে চেয়েছেন আদালত।
আইনজীবী ইশরাত হাসান আশা প্রকাশ করেন, চূড়ান্ত শুনানি শেষে রুল নিষ্পত্তি হলে দেশে মাতৃত্বকালীন ছুটির ক্ষেত্রে বিদ্যমান বৈষম্য দূর হবে এবং কর্মজীবী নারীদের সাংবিধানিক অধিকার আরও সুসংহত হবে।
