জুলাই আন্দোলনে হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) সভাপতি ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুকে তিনটি অভিযোগে ১০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে আনা মোট আটটি অভিযোগের মধ্যে পাঁচটিতে খালাস দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন। বেঞ্চের অন্য দুই সদস্য হলেন অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মঞ্জুরুল বাছিদ এবং জেলা ও দায়রা জজ নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
রায়ে তৃতীয় অভিযোগে ইনুকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এছাড়া ষষ্ঠ ও সপ্তম অভিযোগেও এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ডসহ আরও ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তবে ট্রাইব্যুনাল জানিয়েছেন, সব সাজা যুগপৎভাবে কার্যকর হবে। ফলে তাকে মোট ১০ বছর কারাভোগ করতে হবে।
দুপুর পৌনে ২টায় ট্রাইব্যুনালে রায় ঘোষণা শুরু হয়। এ সময় কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন হাসানুল হক ইনু। ট্রাইব্যুনালের সদস্য বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ রায়ের সারসংক্ষেপ পাঠ করেন। ট্রাইব্যুনালের অনুমতি নিয়ে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন বিটিভিতে রায় ঘোষণা সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।
যেসব অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত
ট্রাইব্যুনাল তৃতীয়, ষষ্ঠ ও সপ্তম অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে রায়ে উল্লেখ করেন।
তৃতীয় অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালের ২০ জুলাই কুষ্টিয়ার তৎকালীন পুলিশ সুপারকে ফোন করে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এর ধারাবাহিকতায় ১৮ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত কুষ্টিয়ায় গুলিতে ছয়জন নিহত হন।
ষষ্ঠ অভিযোগে ২৯ জুলাই ১৪ দলের বৈঠকে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার প্রস্তাবের মাধ্যমে আন্দোলন দমনে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়।
সপ্তম অভিযোগে ৪ আগস্ট কারফিউ জারি ও ‘দেখামাত্র গুলি’ করার সিদ্ধান্তে সমর্থন এবং দলীয় নেতাকর্মীদের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছিল।
অন্য পাঁচটি অভিযোগে ট্রাইব্যুনাল ইনুকে খালাস দেন।
আত্মপক্ষ সমর্থনে যা বলেছিলেন ইনু
বিচার চলাকালে চলতি বছরের ১১ মার্চ ট্রাইব্যুনালে ৬৪ পৃষ্ঠার লিখিত বক্তব্য জমা দিয়ে নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করেন হাসানুল হক ইনু।
তিনি আদালতকে জানান, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো ‘কাল্পনিক’, ‘বানোয়াট’ ও ‘বিদ্বেষপ্রসূত’। লিখিত বক্তব্যে তিনি দাবি করেন, জুলাই আন্দোলনে সংঘটিত কোনো হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার বা তার দলের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না।
এর আগে অভিযোগ গঠনের শুনানিতে নিজেকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার দাবি করে তিনি আদালতের কাছে ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করেছিলেন।
প্রসিকিউশনের দাবি
প্রসিকিউশনের দাবি ছিল, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের অন্যতম শীর্ষ নেতা হিসেবে হাসানুল হক ইনু ‘সুপিরিয়র রেসপন্সিবিলিটি’ বা ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের দায় বহন করেন।
প্রসিকিউশনের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে আন্দোলন দমনে নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও দলীয় ক্যাডারদের নির্দেশনা প্রদান এবং সহিংসতা উসকে দেওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছিলেন।
দীর্ঘ বিচার শেষে রায়
২০২৪ সালের ২৬ আগস্ট রাজধানীর উত্তরা এলাকা থেকে হাসানুল হক ইনুকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে কুষ্টিয়ায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়।
মামলায় তদন্ত কর্মকর্তাসহ প্রসিকিউশনের পক্ষে ১০ জন সাক্ষ্য দেন। আসামিপক্ষে সাক্ষ্য দেন দুজন। এছাড়া আদালতে ২০টি দলিল এবং পাঁচটি বস্তুগত আলামত উপস্থাপন করা হয়।
গত ১৪ মে উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষ হওয়ার পর ট্রাইব্যুনাল মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখেন। মঙ্গলবার সেই মামলার রায় ঘোষণা করা হলো।
প্রকৌশলী থেকে রাজনীতিবিদ
১৯৪৬ সালের ১২ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন হাসানুল হক ইনু। তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৭২ সালে জাসদ গঠনের সময় প্রতিষ্ঠাতা সহ-সভাপতি ছিলেন এবং ২০০২ সাল থেকে দলটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।
২০০৮, ২০১৪ ও ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুষ্টিয়া-২ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন ইনু। ২০১২ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তিনি তথ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন।
